ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন অ্যাপস কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য লাইভ টিভি লাইভ রেডিও সকল পত্রিকা যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
সুখের লাগিয়া এ ঘর বাঁধিনু
Published : Friday, 17 February, 2017 at 12:00 AM
সুখের লাগিয়া এ ঘর বাঁধিনুরাজিয়া সুলতানা ইলি ||
মোশতাক আহমেদ ব্যাংকের সিনিয়র প্রিন্সিপ্যাল অফিসার। তাঁর বয়স প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি। কিন্তু তাঁর সুগঠিত শরীর এবং সুন্দর টসটসে মুখশ্রী দেখে তাঁকে এখনো আটাশ, ত্রিশের তরুণ বলে অনায়াসে চালিয়ে দেয়া যায়। তাঁর স্ত্রী তামান্না সম্পূর্ণ বিপরীত। চল্লিশেই তিনি বেশ বুড়িয়ে গেছেন। চুলে পাক ধরেছে, পেটে চর্বি জমেছে। বিশাল একটা পেট তাঁর। ইদানিং হাঁটতে বেশ কষ্ট হয়। প্রায়ই তামান্না ঈর্ষান্বিত দৃষ্টিতে স্বামীর দিকে তাকান। তিনি কিছুতেই ভেবে পাননা একজন পুরুষ মানুষের অত সুশ্রী চেহারার কি দরকার। এক চোখো আল্লাহর কোন বিচার নেই। নইলে তামান্না কি দেখতে এমন ছিলেন? তাঁর শ্বশুর তো তাঁকে দেখে এক নজরেই পছন্দ করেছিলেন। ফর্সা ধপধপে গায়ের রং। ছিপছিপে দীঘল শরীর। টানা হরিণ চোখ। মায়াকাড়া চেহারা। তিনটি বাচ্চা হতে না হতেই কোথায় গেল সেই দীঘল ছিপছিপে শরীর। কোথায় গেল সেই সুশ্রী মায়াকাড়া চেহারা? তাঁর স্বামী এখনো রোজ খুব ভোরে উঠে জগিং করেন। তামান্নার প্রচ- রাগ হয়। একজন পুরুষ মানুষের এতো সৌন্দর্যচর্চার কি দরকার। তাঁর সন্দেহ হয়। অফিসে মহিলা কলিগ কারো সঙ্গে নিশ্চয়ই তাঁর লটরপটর চলছে। তামান্না অনেকদিন ভেবেছেন, চুপি চুপি একদিন অফিসে গিয়ে মোশতাককে হাতে নাতে ধরবেন। কিন্তু এই ভাবনাটা ভাবনাই রয়ে গেছে। আজো কার্যে পরিণত করতে পারেননি। এই মুখপোড়া শরীরটাই হয়েছে তাঁর কাল। যখনই মোশতাকের অফিসে যাবেন বলে মন স্থির করেন, তখনই শরীরটা যেন কেমন কেমন করতে থাকে। বুক ধড়ফড় বেড়ে যায়। শরীরটা যেন অবশ হয়ে যায়। ডাক্তার আর ওষুধ তাঁর বাঁধা। রোজ রোজ মুড়িমুড়কির মত গাদা গাদা ওষুধ গেলেন। তাঁর চিকিৎসার ব্যাপারে মোশতাক কোন কার্পণ্য করেননা। জামাল বলে একটি ছেলে আছে। কাছেই একটা ওষুধের দোকানে কাজ করে। তাকে মোশতাকের বলা আছে। সে দোকানে যাবার আগে রোজ এবাড়িতে এসে তামান্নার খোঁজ নিয়ে যায়। ডাক্তার এবং ওষুধের সব ব্যবস্থা সেইই করে। মোশতাক তাকে মাসে মাসে টাকা দেন। এতেও তামান্নার রাগ হয়। কেন জামাল কেন। মোশতাক নিজে পারেননা এসব করতে। বাচ্চারা সবাই বড় হয়ে গেছে। বাইরে হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করে। সংসারে এখন কোন  ঝামেলাই নেই। কিন্তু মোশতাক নিজের স্বাস্থ্য ফিট রাখতে সময় পেলে অফিসের পর বিকেলেও পার্কে গিয়ে জগিং করেন। রাতে আল্লাহর তিরিশ দিন কাবে যাওয়া চাইই। তামান্না যতই গজগজ করুন, সাহেবের মুখে টুশব্দটি নেই। এটা স্বীকার করতেই হবে। আজ পর্যন্ত মোশতাক তামান্নার সঙ্গে কখনো কোন খারাপ ব্যবহার করেননি। কিন্তু মোশতাক একবার যেটা করবেন বলে স্থির করেন, সেটা করবেনই। অবিশ্যি তামান্নারও তো আসলে অভিযোগ করবার মত কোন কারণ নেই। হাটবাজার করা এবং বাইরের যাবতীয় কাজ করবার জন্য বজলু আছে। ঘরদোর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা, কাপড় কাচা, রান্না-বান্নার জন্য জমিলা আছে।  নালিশ করবার মত কিছু পাননা বলেই তামান্নার আরো রাগ হয়। আজকাল তামান্নার ক্ষুধাও বেড়ে গেছে। আর অবাক কা-, যাইই খান, তাই স্বাদ লাগে। আজ পর্যন্ত কোন দিন কোন খাবারে অরুচি হয়না। এমন যে কপাল। মানুষের কত ডায়রিয়া হয়। অথচ তাঁর আজ পর্যন্ত ডায়রিয়াও হয়নি। ডায়রিয়া হলেও তো শরীরটা একটু কমতো। এতো প্রচ- হজমশক্তি। যাইই খান, তাই হজম হয়ে যায়। পেটের মধ্যে সর্বক্ষণ সর্বগ্রাসী ক্ষুধা লেগেই আছে। কত ভাবেন, এবার থেকে মোশতাকের মত কম কম খাবেন। আগে কয়েক গ্লাস পানি খেয়ে ক্ষুধাটা কমিয়ে, তারপর ভাত খেতে বসবেন। কোথায় কি। যেই টেবিলে বসেন, অমনি নানান সুখাদ্যের ঘ্রাণ নাকে আসে, অমনি ক্ষুধাটা যেন চাগাড় দিয়ে ওঠে। আর কিছুতেই নিজেকে চেক করতে পারেননা। গোগ্রাসে খেতে থাকেন। পেট ভরে গেলেও মনে হয় আরো খাই। আর জমিলাটাও হয়েছে তেমনি। তার এতো ভালো রান্নার হাত। প্রত্যেকটা আইটেমই হয় দারুণ। সবগুলি পদ দিয়ে খেতে খেতে একেবারে গলা পর্যন্ত খাওয়া হয়ে যায়। জমিলা তো এতো ভালো রান্না না করলে পারে। হায় আল্লাহ। কি উপায় হবে তামান্নার। তামান্না নিজেই বুঝতে পারে, যে হারে মোটা হচ্ছেন, খুব শিগগীরই তিনি বিছানায় পড়ে যাবেন। ছুটিতে বাড়িতে এসে বড় মেয়ে শিমুল তাঁকে ওয়ার্নিং দিয়েছে। বলেছে-‘মা, তুমি কি বলতো? নিজের ভালো তো পাগলেও বুঝে। আর তুমি...। উ: মা কি বলব তোমাকে। তুমি চোখের সামনে তো বাবাকে দেখতে পাচ্ছো। এই বয়সেও বাবা কত সুন্দর। কত ফিট। বাবার জন্য আমাদের গর্ব হয়। কিন্তু মা, তোমার জন্য দু:খ হয়। ভয়ও হয়। তোমার কি ইচ্ছে করেনা বাবার মতো হতে? তুমি তো আজকাল কোন কাজও করনা। সারাদিন শুয়ে বসে থাক। খেয়ে খেয়ে শুয়ে শুয়ে আরো মোটা হচ্ছো সমস্ত বাড়িতে তোমরা দুজন মাত্র মানুষ। কাজের মানুষও দুজন। জমিলার হাতের মজার মজার রান্না খেয়ে দিন দিন শুধু ফুলছো। জমিলাকে ছাড়িয়ে দেয়া এবার আমার প্রধান কাজ। বাধ্য না হলে তুমি নড়াচড়া করবেনা। মা, সিরিয়াসলি বলছি তুমি যদি এইভাবে চলতে থাকো, খুব শিগগীরই তুমি বিচানায় পড়ে যাবে। যদি একবার বিছানায় পড়ো, তাহলে বুঝতে পারবে জীবনটা কত কঠিন। প্রথম প্রথম হয়তো অনেক কেয়ার নেয়া হবে। অনেক সেবাও  পাবে। কিন্তু যতই দিন গড়াবে, ততই সেবা যতœ কমতে থাকবে। তাছাড়া মা, ইচ্ছে থাকলেও আমরা কেউ দীর্ঘদিন তোমার পাশে থাকতে পারবনা। মা প্লিজ বাস্তবতাটা বুঝতে শেখো। তুমি কি চাও আমাদের কেরিয়ার ধ্বংস হয়ে যাক। আমার পড়াশোনা শেষ হতে আরো দুবছর মুকুলের আরো তিন বছর টুটুলের আরো চার বছর। অবিশ্যি যদি আমরা মিস না করি, ঠিকঠাক মত পড়াশোনাটা চালিয়ে যেতে পারি, তবেই এই হিসেবটা মিলবে। আজকাল তোমার বুক ধড়ফড় করে। শরীর অবশ হয়ে যায় মাঝে মাঝে। অনেক দেরী হয়ে গেছে। আমি বাবাকে বলেছি যত দ্রুত সম্ভব তোমাকে স্পেশালিস্ট দেখাতে হবে। একটা থরো চেকআপ করতে হবে। বাবাকে বলেছি। বাবা নাকি অনেকবার তোমাকে বলেছে। ঢাকা গিয়ে বড় স্পেশ্যালিস্ট দেখাতে। কিন্তু তুমি কিছুতেই রাজী হওনি। বাবাকে তো দোষ দেওয়া যায়না। যাক যা হয়েছে হয়েছে। আর অবহেলা করা যাবেনা’। শিমুল থাকতে থাকতেই কথা হয়েছে, আগামী সপ্তাহেই মোশতাক তামান্নাকে নিয়ে ঢাকা যাবেন। বিকেলের চা খেয়ে তামান্না জানালার কাছে বসে বসে আকাশ পাতাল চিন্তা করছিলেন। মেঝেতে বসে জমিলা কাচা কাপড়গুলো ভাজ করছিলো আর বকবক করছিলো । তামান্না কিছু শুনছিলেন না। তিনি শুধু ভাবছিলেন তাঁর না জানি কি ভয়ঙ্কর অসুখ ধরা পড়বে। চিটাগং থেকে তামান্নার ছোটবোন রেজিনা এসেছিলো। কয়েকদিন বেড়িয়ে গেছে। সে তো তামান্নাকে দেখে অবাক। বললো, কি রে আপা, গত বছর তোকে যা দেখে গেছি, এরি মধ্যে তুই দেখি ডাবল হয়ে গেছিস। কি সর্বনাশ। এতো মুটকি হলি কি করে। রেজিনা তামান্নাকে অনেক পরামর্শ দিলো। অবিশ্যি পরামর্শ সে দিতেই পারে। সে তামান্নার চেয়ে মাত্র চার বছরের ছোট। তারও দু’টি সন্তান। কিন্তু আজো রেজিনার ফিগার চমৎকার। হালকা পাতলা দীঘল চেহারা। কিন্তু মুখটা টসটসে। লাবণ্যে ভরা। রেজিনা হাসতে হাসতে মুশতাককে বলে, ‘দুলাভাই, আপনি দেখছি এভারগ্রীণ। মানুষ দিন দিন বুড়ো হয়। আপনি দিন দিন তরুণ হচ্ছেন। রহস্যটা কি বলুন তো?’ মোশতাকও চটুল হেসে বললেন, কে বলছে কাকে। তোমার সৌন্দর্যের রহস্যটা আগে বলো শালি সাহেবা ওরফে আধি ঘরওয়ালি। তোমার আপাকে তোমার গুপ্ত মন্ত্রটা শিখিয়ে দিয়ে যেও। তোমার আপার অবস্থাটা দেখছো তো। কিছু বলতেও পারিনা। এতো অসুখ কামাই করেছে। শুধু ওষুধের উপর আছে।’ রেজিনা বললো, দুলাভাই, আপার স্বাস্থ্য না কমালে অসুখও আপাকে ছাড়বেনা। আপাকে রেগুলার ব্যায়াম করতে হবে। কঠিন পরিশ্রম করতে হবে। সারাক্ষণ শুয়ে বসে থাকলে হবেনা।’ মোশতাক হতাশ ভঙ্গীতে বললেন, ‘দেখো, তুমি যদি বোঝাতে পার। আমি তো বোঝাতে বোঝাতে হয়রান। শুধু বলে, বুক ধড়ফড় করছে। শরীর অবশ হয়ে যাচ্ছে। আমি আর কিছু বলবার ভরসা পাইনা।’ রেজিনা যে কদিন ছিল, যথেষ্ট চেষ্টা করেছে। তামান্নার সঙ্গে খেতে বসে প্রচুর সবজি আর সালাদ খেয়ে নামে মাত্র ভাত খেয়েছে। তাকে দেখে যদি তামান্নার বোধোদয় হয়। কিন্তু তামান্নার পছন্দ সব কোলেস্টরেল যুক্ত খাবার। এসব খাবার রেগুলার খেলে যে প্রেশার, সুগার হার্ট সব রোগে আক্রান্ত হবে, তামান্না সেটা কিছুতেই বুঝতে চায়না। তামান্না বসে বসে মনে মনে এসব কথাই ভাবছিলেন। ভাবছিলেন আর ভয় পাচ্ছিলেন। এমন সময় ঘরে ঢুকলেন পাশের বাড়ির সালেহা খাতুন আর মালেকা বেগম। ওনাদের সঙ্গে তামান্নার অনেকদিনের সম্পর্ক। সালেহা খাতুন একটা কিন্ডার গার্টেনে চাকরি করেন। মালেকা বেগমও একটা প্রাইমারী স্কুলে আছেন। তিন বন্ধুত অনেক সুখ দু:খের গল্প হল। সালেহা বললেন ‘আপা, ঢাকা গিয়ে আপনি ভালো একটা ডাক্তার দেখান। আপনাকে কেমন যেন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। আল্লাহ না করুন, কোন রোগ যদি বাঁধিয়ে বসেন। আগে থেকে সাবধান হওয়া ভাল। মোশতাক ভাই কিন্তু এদিক দিয়ে খুবই সচেতন। এই বয়সেও ওনার ফিগার কত সুন্দর।’
মালেকা বললেন, ‘হবেনা কেন। মোশতাক ভাই তো রেগুলার মর্নিং ওয়াকে যান। আমার বাসার সামনে দিয়ে যান। আমি প্রায়ই দেখি।’ সালেহা বললেন, ‘তাই তো মোশতাক ভাই এখনো এতো সুন্দর। আপা, এতো সুন্দর মানুষটাকে বাইরে পাঠিয়ে আপনি এতো নিশ্চিন্তে থাকেন কি করে। আমি বাপু ভালো আছি আমার টাকলুকে নিয়ে। আর যাই হোক, আমার টাকলুর দিকে কেউ নজর দেবেনা। সেদিক থেকে আমি একেবারে নিশ্চিন্ত’ বলে সশব্দে হেসে উঠলেন। মালেকাও হাসতে লাগলেন। সালেহা আবার বললেন, ‘আপা একটা কথা বলতে চাই। আপনি যদি মাইন্ড না করেন।’ তামান্নার বুকের মধ্যে ধ্বক করে উঠলো। তবু তিনি বহুকষ্টে মুকে হাসি এনে বললেন, ‘বলুননা। অত কিন্তু কিন্তু করছেন কেন।’ সালেহা তবু ইতস্তত করতে লাগলেন। শেষ পর্যন্ত বললেন, ‘আপা, বিশ্বাস করুন, আমরা আপনার ভালো চাই। নইলে কথাটা বলতামনা। আমার এক সহকর্মীর হাসব্যান্ড মোশতাক ভাইয়ের অফিসে চাকরি করেন। তিনি নাকি বলেছেন ব্যাংকের এক ডিভোর্সি মহিলার সঙ্গে মোশতাক ভাইয়ের এফেয়ার চলছে। আপা, আমি কথাটা বিশ্বাস করিনা। আমাদের দেশের মানুষের স্বভাবই হচ্ছে তিলকে তাল করা। তবুও কথা যখন একবার উঠেছে, আপনিও একটু খোঁজ খবর নিন।’ তামান্নার মুখ ছাইয়ের মত ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তাঁর বুকের মধ্যে প্রচ- ধক ধক করতে লাগলো। অনেক কষ্টে গলায় স্বর ফুটিয়ে বললেন, ‘আমার স্বামীকে আমি চিনি। তিনি কখনো এমন কাজ করতে পারেননা। উনি যে আমার কত খেয়াল রাখেন, কত যতœ নেন, সেটা আপনারা জানেননা।’
সালেহা আর মালেকা সমস্বরে বললেন, জানি, সব জানি। কথাটা আমরাও মোটেই বিশ্বাস করিনি। আসলে কেউ ভালো আছে দেখলে তো সকলের চোখ টাটায়। হিংসে হয়। এটা নিছকই গুজব। আপা, প্লিজ রাগ করবেন না, আমরা তিনজন অনেক দিনের বন্ধু। আবার বলছি আপা কিছু মনে রাখবেননা।’ তাঁরা চলে গেলেন। তামান্না শুয়ে পড়লেন। বালিশে মুখ গুজে দিতেই অবাধ্য অশ্রু অঝোর ধারায় ঝরে পড়তে লাগলো। ভেতরে ভেতরে তামান্না ভীষণ মুষড়ে পড়লেন। মুখে যাই বলুন তিনি তো তাঁদের কথা উড়িয়ে দিতে পারছেননা। ওঁরা আসলে তামান্নার শুভাকাঙ্খী। তাই পিছনে পেছনে সমালোচনা না করে সামনা সামনি তাঁকে সাবধান করতে এসেছেন। দুশ্চিন্তায় রাতে তামান্না খেতে পারলেননা। এই প্রথম তামান্না রাতের খাবার খেলেননা। মোশতাক তাঁকে অনেক সাধ্য সাধনা করলেন। কিন্তু তামান্নার মুখে আজ কিছুতেই খাবার উঠলোনা। রাতে ঘুমুতেও পারলেননা তামান্না। মোশতাক বেশ অবাক হলেন। দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে তিনি তামান্নাকে কোনদিন না খেয়ে থাকতে দেখেননি। তেমনি নির্ঘুম রাত কাটাতেও দেখেননি কোনদিন। বারবার তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি হয়েছে তোমার। মাথা ব্যথা করছে? পেট ব্যথা করছে? ডাক্তার ডাকব? কিন্তু তামান্না কোন জবাব দিলেননা। তামান্না মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলেন, ব্যাপারটা যখন এতদূর গড়িয়েছে, বাইরের লোকজনও যখন এই ব্যাপারটা নিয়ে বলাবলি করছে, তখন তাঁকে সত্যিটা বের করতেই হবে। কিন্তু মোশতাককে কোন মতেই কথাটা জানানো যাবেনা। শেষ রাতের দিকে তামান্না একটু ঘুমিয়ে পড়লেন। তাঁর ঘুম ভাঙলো বেশ বেলাতেও। মোশতাক ততক্ষণে অফিসে চলে গেছেন। দুপুরে অফিসের পিয়ন এসে মোশতাকের খাবার নিয়ে গেল। এরপরই তামান্না রওনা হলেন ব্যাংকের দিকে। মোশতাকের রুম দোতালার সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে তামান্না অস্থির হয়ে গেলেন। সমস্ত অফিস এখন শান্ত নিরিবিলি দুপুরের ব্রেকে প্রায় সবাই বাড়িতে খেতে গেছে। হাঁফাতে হাঁফাতে তামান্না মোশতাকের রুমের কাছাকাছি এসেই ভেতরে মোশতাকের কণ্ঠস্বর শুনতে পোলেন। রুমের বাইরে থমকে দাঁড়ালেন তামান্না। শুনতে পেলেন মোশতাক বলছেন, ‘আমি সত্যি টায়ার্ড। আর পারছিনা। এভাবে আর কতদিন চলা যায়। আমার পাশে শুয়ে ভোস ভোস করে ওর নাক ডাকে। ওর নাক ডাকার শব্দে আমার ঘুম ভেঙে যায়। প্রায়ই আমি বালিশ নিয়ে ড্রয়িং রুমে চলে যাই। তারপর সোফাতে শুয়ে ঘুমাই। বিয়ের পর প্রথম কয়েক বছর বাদ দিলে আমাদের দাম্পত্য জীবন বলতে কিছু নেই। রাতের খাবার খাওয়ার পরও সেই যে বিছানায় পড়ে, আর সারারাত ওর হুশ থাকেনা। ও জানেনা, বলতেও পারবেনা কত বিনিদ্র রাত কাটে আমার। আমি হাঁটি। শুধু হাঁটি। তারপর একমসয় শ্রান্ত কান্ত নিদ্রাকতর চোখ দুটি ঘুমে ঢুলে পড়ে। এসবের কিছুই ও জানেনা। ও শুধু জানে আমি একজন সুখী মানুষ। যে শুধু নিজেকে ভালোবাসে । যে শুধু নিজেকে সুন্দর রাখতে, নিজের শরীরকে ফিট রাখতে চায়। ওর জন্য আমি যা করি, সেগুলো কিচ্ছুনা। জানো, ভদ্রলোকের অভিনয় করতে করতে, চুপচাপ শুধু অভিযোগ শুনতে শুনতে আমি আজ শ্রান্ত কান্ত বিধ্বস্ত। সহ্য করতে করতে আজ আমি শেষ সীমায় পৌঁছে গেছি। আমি আর পারছিনা। এ্যাবসার্ত? জাষ্ট পারছিনা। শুধু সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে এতোদিন সহ্য করেছি। এবার একটা কিছু করবার সময় এসেছে।’ এবার একটি মৃদু মহিলা কণ্ঠ শোনা গেল, ‘এখন কি করতে চাও।’ ভাঙ্গা কণ্ঠে মোশতাক বললো, ‘জানিনা। কি করব বুঝতে পারছিনা। এতোকাল ও আমাকে একতরফা কথা শুনিয়ে গেছে। আমি কখনো কোন জবাব দেইনি। শুধু শুনে গেছি। আমাকে কেউ দোষ দিতে পারবেনা। ওর প্রতি, বাচ্চাদের প্রতি কখনো কোন দায়িত্ব, কোন কর্তব্যে আমি অবহেলা করিনি। কিন্তু আমিও তো একটা পুরুষ মানুষ। আমারও তো চাহিদা আছে। ওকি কোনদিন সেসবের খোঁজ রেখেছে? আমার সকালের নাশতা, দুপুরের খাবার, রাতের খাবার সব দেয় কাজের লোক। আমার পোশাক ধোয়া, লন্ড্রিতে দেয়া সব করে কাজের লোক। এমন কি ও কোনদিন এসবের তদারকও করেনা। আমি কখন কি খেলাম বা আদৌ খেলাম কিনা কোন খোঁজই ও রাখেনা। সকালে আমি যখন বেরিয়ে আসি, ও তখন ঘুমে। এতোদিনের মধ্যে একমাত্র গতকাল ব্যতিক্রম দেখলাম। গতরাতে ও খায়নি ঘুমায়নি। অনেকবার জিজ্ঞেস করেছি কি হয়েছে। ডাক্তার ডাকব কিনা। কিচ্ছু বলেনি। যাক অনেক কর্তব্য করেছি। অনেক দায়িত্ব পালন করেছি। আর না। এবার আমি ছুটি চাই।’ আবার একটি মেয়ে কন্ঠ শোনা গেল, ‘কিভাবে ছুটি নেবে।’ মোশতাক বলল, ‘আগামী সপ্তাহে ওকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা নিয়ে যাব। ঢাকা থেকে ফিরে এসে আমি ওকে এবং বাচ্চাদেরকে সব কথা খুলে বলব। বলব, তুমি আমি আমরা দুজন পরস্পরকে ভালোবাসি। ও যদি আমাকে মুক্তি দেয়, আমরা দুজন বিয়ে করে শেষ জীবনটা অন্তত: শান্তিতে কাটাতে চাই।’ তামান্নার হৃৎস্পন্দন থেমে যাবার উপক্রম হল। সমস্ত শরীর অবশ হয়ে গেছে। থরপর করে কাঁপতে কাঁপতে ফোরে পড়ে জ্ঞান হারালেন তামান্না।

কুমিল্লা নামেই বিভাগ চাই...
কুমিল্লার সর্বত্র এখন কুমিল্লা বিভাগ-এর নামকরণ প্রসঙ্গ আলোচিত হচ্ছে। গত কয়েকদিন জগিং করতে করতেও একই প্রসঙ্গে কথাবার্তা কানে আসলো। গত কয়েকদিন ফেসবুকেও একই বিষয় নিয়ে স্ট্যাটাস এবং নানা মন্তব্য চোখে পরেছে। কুমিল্লার রাজপথ, পূবালী চত্বর আবার সরব কুমিল্লা নামেই কুমিল্লা বিভাগের নামকরণ প্রসঙ্গে।
-
এই প্রসঙ্গে ফেসবুকে আমার স্ট্যাটাস ছিল- “কুমিল্লা” নাম সংযুক্ত করেই ‘কুমিল্লা বিভাগ’ হতে হবে। এটাই ঐতিহাসিক স্বাভাবিকতা ও পরিণতি। কুমিল্লার মধ্যেই ‘ময়নামতি’ ধারিত থাকে এবং থাকবে। ‘ময়নামতি’ দিয়ে কুমিল্লাকে পরিচিত করবার প্রয়োজন নেই। কুমিল্লার সাথে মনস্তাত্বিক-আবেগ-বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সংযোগহীন এবং ভিন্ন উদ্দেশ্য থাকলেই কুমিল্লা বিভাগকে অন্য নাম কল্পনা করা সম্ভব যা ভয়াবহ অস্বাভাবিকতা এবং অগ্রহণযোগ্য! সামাজিক প্রতিক্রিয়া দেখে আশা করি ইতোমধ্যে সবার বোধগম্য হবে যে ‘কুমিল্লা বিভাগ’ নামেই বিভাগ করতে হবে! নইলে এই সামাজিক প্রতিক্রিয়া দাবি আদায়ের সামাজিক আন্দোলনে রূপান্তরিত হবে..."
-
কুমিল্লা বিভাগকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সমাজ প্রতিক্রিয়া দেখেশুনে মনে হলো দুটি প্রসঙ্গ অত্যন্ত প্রধান হয়ে সামনে এসেছে! এক. কেন বিভাগটির নাম ‘ময়নামতি বিভাগ' না হয়ে ‘কুমিল্লা বিভাগ’ হওয়া উচিত! দুই. বিভাগটির দাবি-বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় কার অবদান কত বেশি ইত্যাদি!
-
আমার মনে হয় সরকার যদি আসলেই সামগ্রিকভাবে বিভাগের নামকরণে ‘নীতি’ হিসেবে অঞ্চলের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে প্রাধান্য দিতে চান তাহলে বাংলাদেশের সকল বিভাগের নাম একযোগে পরিবর্তন করতে পারেন! ফেসবুক থেকে পাওয়া একটি প্রস্তাবনা আমি উল্লেখ করছি! যেমন- বরেন্দ্র (রাজশাহী), হরিকেল (চট্টগ্রাম), বঙ্গ (ঢাকা), খাড়ি (খুলনা), চন্দ্রদ্বীপ/বঙ্গাল (বরিশাল), পুন্ড্র (রংপুর), কামরুপ/শ্রীহট্ট (সিলেট), গৌড় (ময়মনসিংহ), সমতট (কুমিল্লা) ইত্যাদি! কিন্তু হঠাৎ করে কুমিল্লা বিভাগের নাম বিচ্ছিন্নভাবে ‘ময়নামতি বিভাগ’ ঘোষণা করাকে কোনো বিচারেই কুমিল্লার মানুষ সমর্থন কিংবা গ্রহণ করবেনা!
-
সামাজিক প্রতিক্রিয়া-লেখালেখির মাধ্যমে আমরা আরো জেনেছি যে কুমিল্লা বিভাগের দাবিতে আন্দোলন চলে এসেছে সুদীর্ঘ সময় থেকেই! বিভাগ বাস্তবায়নের ইতিহাস রচনা করতে হলে এর যথাযথ কৃতিত্ব তুলে দিতে হবে সম্পর্কিত সবাইকে! একথাও শুনা যাচ্ছে যে শুধু একজন ব্যক্তির ভূমিকা-কৃতিত্বকে ম্লান-গুরুত্বহীন করবার জন্যে কুমিল্লা বিভাগের নাম 'ময়নামতি বিভাগ' করবার চিন্তা-ভাবনা হয়েছে! যদি তা হয়ে থাকে তবে চিন্তাটি হীন এবং অগ্রহণযোগ্য বটে! বিষয়টি কোনো ব্যক্তির একার কৃতিত্বের বিষয় নয় বা তা কেড়ে নেবার কৃপণ পদপে নয় কোনোমতেই! কুমিল্লাবাসী হিসেবে এটাই সবার অনুভূতি যে কুমিল্লা বিভাগের নাম কুমিল্লা নামেই হতে হবে! এই দাবি এখন আপামর কুমিল্লাবাসীর!
-
অর্থাৎ, আমরা কুমিল্লার নাম সংযুক্ত করেই ‘কুমিল্লা বিভাগ’ চাই এবং এই বিভাগ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় প্রতিটি মানুষের চিন্তা-ত্যাগ-ভূমিকার যথাযথ-অকৃপণ উল্লেখ ও মূল্যায়ন চাই...
সুখের লাগিয়া এ ঘর বাঁধিনু
রাজিয়া সুলতানা ইলি
মোশতাক আহমেদ ব্যাংকের সিনিয়র প্রিন্সিপ্যাল অফিসার। তাঁর বয়স প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি। কিন্তু তাঁর সুগঠিত শরীর এবং সুন্দর টসটসে মুখশ্রী দেখে তাঁকে এখনো আটাশ, ত্রিশের তরুণ বলে অনায়াসে চালিয়ে দেয়া যায়। তাঁর স্ত্রী তামান্না সম্পূর্ণ বিপরীত। চল্লিশেই তিনি বেশ বুড়িয়ে গেছেন। চুলে পাক ধরেছে, পেটে চর্বি জমেছে। বিশাল একটা পেট তাঁর। ইদানিং হাঁটতে বেশ কষ্ট হয়। প্রায়ই তামান্না ঈর্ষান্বিত দৃষ্টিতে স্বামীর দিকে তাকান। তিনি কিছুতেই ভেবে পাননা একজন পুরুষ মানুষের অত সুশ্রী চেহারার কি দরকার। এক চোখো আল্লাহর কোন বিচার নেই। নইলে তামান্না কি দেখতে এমন ছিলেন? তাঁর শ্বশুর তো তাঁকে দেখে এক নজরেই পছন্দ করেছিলেন। ফর্সা ধপধপে গায়ের রং। ছিপছিপে দীঘল শরীর। টানা হরিণ চোখ। মায়াকাড়া চেহারা। তিনটি বাচ্চা হতে না হতেই কোথায় গেল সেই দীঘল ছিপছিপে শরীর। কোথায় গেল সেই সুশ্রী মায়াকাড়া চেহারা? তাঁর স্বামী এখনো রোজ খুব ভোরে উঠে জগিং করেন। তামান্নার প্রচ- রাগ হয়। একজন পুরুষ মানুষের এতো সৌন্দর্যচর্চার কি দরকার। তাঁর সন্দেহ হয়। অফিসে মহিলা কলিগ কারো সঙ্গে নিশ্চয়ই তাঁর লটরপটর চলছে। তামান্না অনেকদিন ভেবেছেন, চুপি চুপি একদিন অফিসে গিয়ে মোশতাককে হাতে নাতে ধরবেন। কিন্তু এই ভাবনাটা ভাবনাই রয়ে গেছে। আজো কার্যে পরিণত করতে পারেননি। এই মুখপোড়া শরীরটাই হয়েছে তাঁর কাল। যখনই মোশতাকের অফিসে যাবেন বলে মন স্থির করেন, তখনই শরীরটা যেন কেমন কেমন করতে থাকে। বুক ধড়ফড় বেড়ে যায়। শরীরটা যেন অবশ হয়ে যায়। ডাক্তার আর ওষুধ তাঁর বাঁধা। রোজ রোজ মুড়িমুড়কির মত গাদা গাদা ওষুধ গেলেন। তাঁর চিকিৎসার ব্যাপারে মোশতাক কোন কার্পণ্য করেননা। জামাল বলে একটি ছেলে আছে। কাছেই একটা ওষুধের দোকানে কাজ করে। তাকে মোশতাকের বলা আছে। সে দোকানে যাবার আগে রোজ এবাড়িতে এসে তামান্নার খোঁজ নিয়ে যায়। ডাক্তার এবং ওষুধের সব ব্যবস্থা সেইই করে। মোশতাক তাকে মাসে মাসে টাকা দেন। এতেও তামান্নার রাগ হয়। কেন জামাল কেন। মোশতাক নিজে পারেননা এসব করতে। বাচ্চারা সবাই বড় হয়ে গেছে। বাইরে হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করে। সংসারে এখন কোন  ঝামেলাই নেই। কিন্তু মোশতাক নিজের স্বাস্থ্য ফিট রাখতে সময় পেলে অফিসের পর বিকেলেও পার্কে গিয়ে জগিং করেন। রাতে আল্লাহর তিরিশ দিন কাবে যাওয়া চাইই। তামান্না যতই গজগজ করুন, সাহেবের মুখে টুশব্দটি নেই। এটা স্বীকার করতেই হবে। আজ পর্যন্ত মোশতাক তামান্নার সঙ্গে কখনো কোন খারাপ ব্যবহার করেননি। কিন্তু মোশতাক একবার যেটা করবেন বলে স্থির করেন, সেটা করবেনই। অবিশ্যি তামান্নারও তো আসলে অভিযোগ করবার মত কোন কারণ নেই। হাটবাজার করা এবং বাইরের যাবতীয় কাজ করবার জন্য বজলু আছে। ঘরদোর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা, কাপড় কাচা, রান্না-বান্নার জন্য জমিলা আছে।  নালিশ করবার মত কিছু পাননা বলেই তামান্নার আরো রাগ হয়। আজকাল তামান্নার ক্ষুধাও বেড়ে গেছে। আর অবাক কা-, যাইই খান, তাই স্বাদ লাগে। আজ পর্যন্ত কোন দিন কোন খাবারে অরুচি হয়না। এমন যে কপাল। মানুষের কত ডায়রিয়া হয়। অথচ তাঁর আজ পর্যন্ত ডায়রিয়াও হয়নি। ডায়রিয়া হলেও তো শরীরটা একটু কমতো। এতো প্রচ- হজমশক্তি। যাইই খান, তাই হজম হয়ে যায়। পেটের মধ্যে সর্বক্ষণ সর্বগ্রাসী ক্ষুধা লেগেই আছে। কত ভাবেন, এবার থেকে মোশতাকের মত কম কম খাবেন। আগে কয়েক গ্লাস পানি খেয়ে ক্ষুধাটা কমিয়ে, তারপর ভাত খেতে বসবেন। কোথায় কি। যেই টেবিলে বসেন, অমনি নানান সুখাদ্যের ঘ্রাণ নাকে আসে, অমনি ক্ষুধাটা যেন চাগাড় দিয়ে ওঠে। আর কিছুতেই নিজেকে চেক করতে পারেননা। গোগ্রাসে খেতে থাকেন। পেট ভরে গেলেও মনে হয় আরো খাই। আর জমিলাটাও হয়েছে তেমনি। তার এতো ভালো রান্নার হাত। প্রত্যেকটা আইটেমই হয় দারুণ। সবগুলি পদ দিয়ে খেতে খেতে একেবারে গলা পর্যন্ত খাওয়া হয়ে যায়। জমিলা তো এতো ভালো রান্না না করলে পারে। হায় আল্লাহ। কি উপায় হবে তামান্নার। তামান্না নিজেই বুঝতে পারে, যে হারে মোটা হচ্ছেন, খুব শিগগীরই তিনি বিছানায় পড়ে যাবেন। ছুটিতে বাড়িতে এসে বড় মেয়ে শিমুল তাঁকে ওয়ার্নিং দিয়েছে। বলেছে-‘মা, তুমি কি বলতো? নিজের ভালো তো পাগলেও বুঝে। আর তুমি...। উ: মা কি বলব তোমাকে। তুমি চোখের সামনে তো বাবাকে দেখতে পাচ্ছো। এই বয়সেও বাবা কত সুন্দর। কত ফিট। বাবার জন্য আমাদের গর্ব হয়। কিন্তু মা, তোমার জন্য দু:খ হয়। ভয়ও হয়। তোমার কি ইচ্ছে করেনা বাবার মতো হতে? তুমি তো আজকাল কোন কাজও করনা। সারাদিন শুয়ে বসে থাক। খেয়ে খেয়ে শুয়ে শুয়ে আরো মোটা হচ্ছো সমস্ত বাড়িতে তোমরা দুজন মাত্র মানুষ। কাজের মানুষও দুজন। জমিলার হাতের মজার মজার রান্না খেয়ে দিন দিন শুধু ফুলছো। জমিলাকে ছাড়িয়ে দেয়া এবার আমার প্রধান কাজ। বাধ্য না হলে তুমি নড়াচড়া করবেনা। মা, সিরিয়াসলি বলছি তুমি যদি এইভাবে চলতে থাকো, খুব শিগগীরই তুমি বিচানায় পড়ে যাবে। যদি একবার বিছানায় পড়ো, তাহলে বুঝতে পারবে জীবনটা কত কঠিন। প্রথম প্রথম হয়তো অনেক কেয়ার নেয়া হবে। অনেক সেবাও  পাবে। কিন্তু যতই দিন গড়াবে, ততই সেবা যতœ কমতে থাকবে। তাছাড়া মা, ইচ্ছে থাকলেও আমরা কেউ দীর্ঘদিন তোমার পাশে থাকতে পারবনা। মা প্লিজ বাস্তবতাটা বুঝতে শেখো। তুমি কি চাও আমাদের কেরিয়ার ধ্বংস হয়ে যাক। আমার পড়াশোনা শেষ হতে আরো দুবছর মুকুলের আরো তিন বছর টুটুলের আরো চার বছর। অবিশ্যি যদি আমরা মিস না করি, ঠিকঠাক মত পড়াশোনাটা চালিয়ে যেতে পারি, তবেই এই হিসেবটা মিলবে। আজকাল তোমার বুক ধড়ফড় করে। শরীর অবশ হয়ে যায় মাঝে মাঝে। অনেক দেরী হয়ে গেছে। আমি বাবাকে বলেছি যত দ্রুত সম্ভব তোমাকে স্পেশালিস্ট দেখাতে হবে। একটা থরো চেকআপ করতে হবে। বাবাকে বলেছি। বাবা নাকি অনেকবার তোমাকে বলেছে। ঢাকা গিয়ে বড় স্পেশ্যালিস্ট দেখাতে। কিন্তু তুমি কিছুতেই রাজী হওনি। বাবাকে তো দোষ দেওয়া যায়না। যাক যা হয়েছে হয়েছে। আর অবহেলা করা যাবেনা’। শিমুল থাকতে থাকতেই কথা হয়েছে, আগামী সপ্তাহেই মোশতাক তামান্নাকে নিয়ে ঢাকা যাবেন। বিকেলের চা খেয়ে তামান্না জানালার কাছে বসে বসে আকাশ পাতাল চিন্তা করছিলেন। মেঝেতে বসে জমিলা কাচা কাপড়গুলো ভাজ করছিলো আর বকবক করছিলো । তামান্না কিছু শুনছিলেন না। তিনি শুধু ভাবছিলেন তাঁর না জানি কি ভয়ঙ্কর অসুখ ধরা পড়বে। চিটাগং থেকে তামান্নার ছোটবোন রেজিনা এসেছিলো। কয়েকদিন বেড়িয়ে গেছে। সে তো তামান্নাকে দেখে অবাক। বললো, কি রে আপা, গত বছর তোকে যা দেখে গেছি, এরি মধ্যে তুই দেখি ডাবল হয়ে গেছিস। কি সর্বনাশ। এতো মুটকি হলি কি করে। রেজিনা তামান্নাকে অনেক পরামর্শ দিলো। অবিশ্যি পরামর্শ সে দিতেই পারে। সে তামান্নার চেয়ে মাত্র চার বছরের ছোট। তারও দু’টি সন্তান। কিন্তু আজো রেজিনার ফিগার চমৎকার। হালকা পাতলা দীঘল চেহারা। কিন্তু মুখটা টসটসে। লাবণ্যে ভরা। রেজিনা হাসতে হাসতে মুশতাককে বলে, ‘দুলাভাই, আপনি দেখছি এভারগ্রীণ। মানুষ দিন দিন বুড়ো হয়। আপনি দিন দিন তরুণ হচ্ছেন। রহস্যটা কি বলুন তো?’ মোশতাকও চটুল হেসে বললেন, কে বলছে কাকে। তোমার সৌন্দর্যের রহস্যটা আগে বলো শালি সাহেবা ওরফে আধি ঘরওয়ালি। তোমার আপাকে তোমার গুপ্ত মন্ত্রটা শিখিয়ে দিয়ে যেও। তোমার আপার অবস্থাটা দেখছো তো। কিছু বলতেও পারিনা। এতো অসুখ কামাই করেছে। শুধু ওষুধের উপর আছে।’ রেজিনা বললো, দুলাভাই, আপার স্বাস্থ্য না কমালে অসুখও আপাকে ছাড়বেনা। আপাকে রেগুলার ব্যায়াম করতে হবে। কঠিন পরিশ্রম করতে হবে। সারাক্ষণ শুয়ে বসে থাকলে হবেনা।’ মোশতাক হতাশ ভঙ্গীতে বললেন, ‘দেখো, তুমি যদি বোঝাতে পার। আমি তো বোঝাতে বোঝাতে হয়রান। শুধু বলে, বুক ধড়ফড় করছে। শরীর অবশ হয়ে যাচ্ছে। আমি আর কিছু বলবার ভরসা পাইনা।’ রেজিনা যে কদিন ছিল, যথেষ্ট চেষ্টা করেছে। তামান্নার সঙ্গে খেতে বসে প্রচুর সবজি আর সালাদ খেয়ে নামে মাত্র ভাত খেয়েছে। তাকে দেখে যদি তামান্নার বোধোদয় হয়। কিন্তু তামান্নার পছন্দ সব কোলেস্টরেল যুক্ত খাবার। এসব খাবার রেগুলার খেলে যে প্রেশার, সুগার হার্ট সব রোগে আক্রান্ত হবে, তামান্না সেটা কিছুতেই বুঝতে চায়না। তামান্না বসে বসে মনে মনে এসব কথাই ভাবছিলেন। ভাবছিলেন আর ভয় পাচ্ছিলেন। এমন সময় ঘরে ঢুকলেন পাশের বাড়ির সালেহা খাতুন আর মালেকা বেগম। ওনাদের সঙ্গে তামান্নার অনেকদিনের সম্পর্ক। সালেহা খাতুন একটা কিন্ডার গার্টেনে চাকরি করেন। মালেকা বেগমও একটা প্রাইমারী স্কুলে আছেন। তিন বন্ধুত অনেক সুখ দু:খের গল্প হল। সালেহা বললেন ‘আপা, ঢাকা গিয়ে আপনি ভালো একটা ডাক্তার দেখান। আপনাকে কেমন যেন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। আল্লাহ না করুন, কোন রোগ যদি বাঁধিয়ে বসেন। আগে থেকে সাবধান হওয়া ভাল। মোশতাক ভাই কিন্তু এদিক দিয়ে খুবই সচেতন। এই বয়সেও ওনার ফিগার কত সুন্দর।’
মালেকা বললেন, ‘হবেনা কেন। মোশতাক ভাই তো রেগুলার মর্নিং ওয়াকে যান। আমার বাসার সামনে দিয়ে যান। আমি প্রায়ই দেখি।’ সালেহা বললেন, ‘তাই তো মোশতাক ভাই এখনো এতো সুন্দর। আপা, এতো সুন্দর মানুষটাকে বাইরে পাঠিয়ে আপনি এতো নিশ্চিন্তে থাকেন কি করে। আমি বাপু ভালো আছি আমার টাকলুকে নিয়ে। আর যাই হোক, আমার টাকলুর দিকে কেউ নজর দেবেনা। সেদিক থেকে আমি একেবারে নিশ্চিন্ত’ বলে সশব্দে হেসে উঠলেন। মালেকাও হাসতে লাগলেন। সালেহা আবার বললেন, ‘আপা একটা কথা বলতে চাই। আপনি যদি মাইন্ড না করেন।’ তামান্নার বুকের মধ্যে ধ্বক করে উঠলো। তবু তিনি বহুকষ্টে মুকে হাসি এনে বললেন, ‘বলুননা। অত কিন্তু কিন্তু করছেন কেন।’ সালেহা তবু ইতস্তত করতে লাগলেন। শেষ পর্যন্ত বললেন, ‘আপা, বিশ্বাস করুন, আমরা আপনার ভালো চাই। নইলে কথাটা বলতামনা। আমার এক সহকর্মীর হাসব্যান্ড মোশতাক ভাইয়ের অফিসে চাকরি করেন। তিনি নাকি বলেছেন ব্যাংকের এক ডিভোর্সি মহিলার সঙ্গে মোশতাক ভাইয়ের এফেয়ার চলছে। আপা, আমি কথাটা বিশ্বাস করিনা। আমাদের দেশের মানুষের স্বভাবই হচ্ছে তিলকে তাল করা। তবুও কথা যখন একবার উঠেছে, আপনিও একটু খোঁজ খবর নিন।’ তামান্নার মুখ ছাইয়ের মত ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তাঁর বুকের মধ্যে প্রচ- ধক ধক করতে লাগলো। অনেক কষ্টে গলায় স্বর ফুটিয়ে বললেন, ‘আমার স্বামীকে আমি চিনি। তিনি কখনো এমন কাজ করতে পারেননা। উনি যে আমার কত খেয়াল রাখেন, কত যতœ নেন, সেটা আপনারা জানেননা।’
সালেহা আর মালেকা সমস্বরে বললেন, জানি, সব জানি। কথাটা আমরাও মোটেই বিশ্বাস করিনি। আসলে কেউ ভালো আছে দেখলে তো সকলের চোখ টাটায়। হিংসে হয়। এটা নিছকই গুজব। আপা, প্লিজ রাগ করবেন না, আমরা তিনজন অনেক দিনের বন্ধু। আবার বলছি আপা কিছু মনে রাখবেননা।’ তাঁরা চলে গেলেন। তামান্না শুয়ে পড়লেন। বালিশে মুখ গুজে দিতেই অবাধ্য অশ্রু অঝোর ধারায় ঝরে পড়তে লাগলো। ভেতরে ভেতরে তামান্না ভীষণ মুষড়ে পড়লেন। মুখে যাই বলুন তিনি তো তাঁদের কথা উড়িয়ে দিতে পারছেননা। ওঁরা আসলে তামান্নার শুভাকাঙ্খী। তাই পিছনে পেছনে সমালোচনা না করে সামনা সামনি তাঁকে সাবধান করতে এসেছেন। দুশ্চিন্তায় রাতে তামান্না খেতে পারলেননা। এই প্রথম তামান্না রাতের খাবার খেলেননা। মোশতাক তাঁকে অনেক সাধ্য সাধনা করলেন। কিন্তু তামান্নার মুখে আজ কিছুতেই খাবার উঠলোনা। রাতে ঘুমুতেও পারলেননা তামান্না। মোশতাক বেশ অবাক হলেন। দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে তিনি তামান্নাকে কোনদিন না খেয়ে থাকতে দেখেননি। তেমনি নির্ঘুম রাত কাটাতেও দেখেননি কোনদিন। বারবার তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি হয়েছে তোমার। মাথা ব্যথা করছে? পেট ব্যথা করছে? ডাক্তার ডাকব? কিন্তু তামান্না কোন জবাব দিলেননা। তামান্না মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলেন, ব্যাপারটা যখন এতদূর গড়িয়েছে, বাইরের লোকজনও যখন এই ব্যাপারটা নিয়ে বলাবলি করছে, তখন তাঁকে সত্যিটা বের করতেই হবে। কিন্তু মোশতাককে কোন মতেই কথাটা জানানো যাবেনা। শেষ রাতের দিকে তামান্না একটু ঘুমিয়ে পড়লেন। তাঁর ঘুম ভাঙলো বেশ বেলাতেও। মোশতাক ততক্ষণে অফিসে চলে গেছেন। দুপুরে অফিসের পিয়ন এসে মোশতাকের খাবার নিয়ে গেল। এরপরই তামান্না রওনা হলেন ব্যাংকের দিকে। মোশতাকের রুম দোতালার সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে তামান্না অস্থির হয়ে গেলেন। সমস্ত অফিস এখন শান্ত নিরিবিলি দুপুরের ব্রেকে প্রায় সবাই বাড়িতে খেতে গেছে। হাঁফাতে হাঁফাতে তামান্না মোশতাকের রুমের কাছাকাছি এসেই ভেতরে মোশতাকের কণ্ঠস্বর শুনতে পোলেন। রুমের বাইরে থমকে দাঁড়ালেন তামান্না। শুনতে পেলেন মোশতাক বলছেন, ‘আমি সত্যি টায়ার্ড। আর পারছিনা। এভাবে আর কতদিন চলা যায়। আমার পাশে শুয়ে ভোস ভোস করে ওর নাক ডাকে। ওর নাক ডাকার শব্দে আমার ঘুম ভেঙে যায়। প্রায়ই আমি বালিশ নিয়ে ড্রয়িং রুমে চলে যাই। তারপর সোফাতে শুয়ে ঘুমাই। বিয়ের পর প্রথম কয়েক বছর বাদ দিলে আমাদের দাম্পত্য জীবন বলতে কিছু নেই। রাতের খাবার খাওয়ার পরও সেই যে বিছানায় পড়ে, আর সারারাত ওর হুশ থাকেনা। ও জানেনা, বলতেও পারবেনা কত বিনিদ্র রাত কা



সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৬
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
কার্যালয়: কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশন, তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়,কুমিল্লা-৩৫০০, বাংলাদেশ
ফোন: +৮৮০ ৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২৪৪৩, +৮৮০ ১৭১৮০৮৯৩০২
ই মেইল: hridoycomilla@yahoo.com, newscomillarkagoj@gmail.com,  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশান।
তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : hridoycomilla@yahoo.com Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};