ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন অ্যাপস কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য লাইভ টিভি লাইভ রেডিও সকল পত্রিকা যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
পড়াশোনাটা যেন আনন্দের হয়, আতঙ্কের নয়
Published : Saturday, 7 January, 2017 at 2:11 AM
পড়াশোনাটা যেন আনন্দের হয়, আতঙ্কের নয়প্রভাষ আমিন ||
কোনো পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের দিনটি আমার দারুণ লাগে। ছেলেবেলায় ঘুরে ঘুরে খোঁজ নিতাম কে ম্যাট্রিক দিলো, কে ইন্টারমেডিয়েট দিলো। নিজে যখন পরীক্ষা দিয়েছি, তখনও দারুণ উৎকণ্ঠা। পত্রিকার পৃষ্ঠাজুড়ে ছাপা হতো ফলাফল। স্কুলে টানিয়ে দেয়া হতো।
আমরা যখন সাংবাদিকতা শুরু করি, তখনও পত্রিকা অফিসে রেজাল্ট আসতো। পরে খালি পরিসংখ্যান পাঠানো হতো। এখন তো সব হাতে হাতে, মোবাইলে। যদিও দরকার নেই, তবু ছেলেমেয়েরা এখনও স্কুলে যায়। যায় মূলত আড্ডা মারতে, হইচই করতে, সেলফি তুলতে। মানুষের জীবন যেভাবে ভার্চুয়াল হয়ে যাচ্ছে, তাতে ভবিষ্যতে হয়তো আর কেউ ফল আনতে স্কুলে যাবে না।
টেলিভিশন ক্যামেরাওয়ালাদের জন্য সামনে দুর্দিন অপেক্ষা করছে। মন্ত্রীর ব্রিফিং ছাড়া আর কিছু পাবে না তারা। দুর্দিন আমার জন্যও। ফলাফল প্রকাশের দিনটি যে আমার দারুণ লাগে, তার কারণ এটাই। অনেকগুলো ছেলেমেয়ের হাসিখুশি মুখ দেখতে, উচ্ছ্বাস দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে টিভি দেখি, পরদিন পত্রিকা পড়ি। আমাদের সময় পাশের হার ছিল ৩০ শতাংশের আশেপাশে। এখন পাশের হার ৯০ শতাংশের আশেপাশে।
আগে ফলাফলের মেধা তালিকা প্রকাশিত হতো, কেউ কেউ স্টার মার্কস পেতো। এছাড়া প্রথম বিভাগ, দ্বিতীয় বিভাগ, তৃতীয় বিভাগ এভাবে ভাগ হতো। ৭৫ ভাগ নম্বর পেলে স্টার মার্কস হতো। ৬০ ভাগ নম্বর হলে প্রথম বিভাগ হতো। পাশ হতো ৩৩ পেলে। প্রতি বোর্ডের মেধা তালিকায় থাকতেন ২০ জন। স্টার মার্কস পাওয়ার সংখ্যাও খুব বেশি নয়। আমি ম্যাট্রিক ও ইন্টারমিডিয়েটে প্রথম বিভাগ পেয়েছিলাম। এবং তা যথেষ্ট ভালো ফলাফল হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
গ্রামের স্কুল থেকে প্রথম বিভাগ পাওয়াই আসলে অনেক ভালো ছিল। অভিভাবকদের প্রত্যাশাও ছিল তাই। যারা স্টার পেতো বা মেধা তালিকায় থাকতো মানে স্ট্যান্ড করতো, তারা তো রীতিমত তারকা। পত্রিকায় তাদের সাক্ষাতকার ছাপা হতো, বাবা-মার মাঝখানে বসিয়ে তাদের ছবি ছাপা হতো।
এখন জমানা বদলে গেছে। এখন ফলাফল প্রকাশিত হয় জিপিএ পদ্ধতিতে। সবচেয়ে ভালো ফল হলো জিপিএ-৫। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো জিপিএ-৫ পায় হাজারের ঘরে নয়, লাখের ঘরে। ফলে এখন আর ফলাফলে তারকা নেই। এরচেয়ে ভালো কিছু নেই। তবু শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা ভালোর আরেকটি মাত্রা ঠিক করে নিয়েছে- গোল্ডেন জিপিএ-৫। যারা সব বিষয়ে এ+, মানে ৮০ শতাংশের বেশি নম্বর পায় তারাই গোল্ডেন জিপিএ।
এই গোল্ডেনের সংখ্যাও কম নয়। ব্যাপারটি বিস্ময়কর। গড়ে সব বিষয়ে ৮০ ভাগের ওপর নম্বর পায়, এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা এখন দেশে লাখের ওপরে। আমাদের সময় যেটা ৬০ শতাংশ ছিল, এখন সেটা ৮০ শতাংশ। আমাদের সন্তানেরা অবশ্যই আমাদের চেয়ে মেধাবী।
বুড়ো বয়সেও পাবলিক পরীক্ষার ফল নিয়ে আমার আগ্রহের আরেকটা কারণ আছে। আমাদের একমাত্র সন্তান প্রসূন এবার জেএসসি পাশ করেছে। প্রসূন জিপিএ-৫ পাবে এটা আমি নিশ্চিত ছিলাম। বছরজুড়ে যেমন স্কুল-কোচিং-মডেল টেস্ট চলেছে, তাতে চেষ্টা করলেও তার পক্ষে জিপিএ-৫ না পাওয়া সম্ভব ছিল না। আর নিজের ছেলে বলে নয়, প্রসূনের মেধার ওপর আমার বরাবরই আস্থা ছিল। তাই এ নিয়ে আমার মধ্যে কোনো উৎকণ্ঠা ছিল না।
২৯ ডিসেম্বর একই সঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী-পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। সেদিন সকালে অফিসে জরুরি মিটিং ছিল। আমার স্ত্রী মুক্তি একাধিকবার ফোন করে রেজাল্ট জানতে চেয়েছিল। তার উৎকণ্ঠাটা আমি বুঝি। পড়াশোনার ব্যাপারে প্রসূন যতটা সিরিয়াস, মুক্তি তারচেয়ে কম নয়। মিটিংয়ে ছিলাম বলে, আমি ফোনের এ পাশে হুম, হ্যাঁ বলে চালিয়েছি।
একবার ফোনে মুক্তির গলা শুনে চমকে গেলাম, কোনো বিপর্যয় হলো নাকি? প্রসূন ফেল-টেল করে বসেনি তো। মুক্তি জানালো, প্রসূন জিপিএ-৫ পেয়েছে। আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। মুক্তি জানালো, তবে গোল্ডেন জিপিএ পায়নি। আমি জিপিএ-৫ আর গোল্ডেনের ফারাকটা অত ভালো বুঝি না। গোল্ডেন পায়নি বলে মুক্তি এত আপসেট কেন তাও বুঝতে পারছিলাম না। ছেলের রেজাল্ট ফেলে মিটিং করছি বলে ফোনেই কিছুক্ষণ ঝাড়াঝাড়ি চললো।
অফিসে সবাই মিষ্টি খেতে চাইলো। বললাম, দাঁড়ান আগে বুঝে নেই, রেজাল্ট ভালো না খারাপ। বাসায় ফিরে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। মুক্তির মুখ থমথমে, প্রসূন হাউমাউ করে কাঁদছে। মুক্তি সাবধান করে দিলো, আমি রেজাল্ট নিয়ে প্রসূনকে যেন কোনো প্রশ্রয় না দেই, যেন ফেসবুকে কোনো স্ট্যাটাসও না দেই। তবে সব দেখেশুনে আমার মনে হলো প্রসূনের রেজাল্ট খুব ভালো হয়েছে, তবে মুক্তি ফেল করেছে। কারণ প্রসূনের সার্কেলের অনেকেই গোল্ডেন জিপিএ পেয়েছে।
আমি বিষয়টি হালকা করার জন্য মুক্তিকে বললাম, তুমি নাকি মিষ্টি না খাওয়ানোর জন্য ভাব ধরছো যে রেজাল্ট খারাপ হয়েছে। ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেল ১৩ বিষয়ের ১২টিতেই প্রসূন এ+ পেয়েছে। শুধু বাংলায় এ পেয়েছে। এ তো দেখি বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা। আমি নিজে বাংলা সাহিত্যের ছাত্র। আর আমার ছেলেই কিনা, বাংলায় ‘এ’ পেয়েছে।
তবে ‘এ’ মানে কিন্তু ফেল নয়। হয়তো প্রসূন ৭৮ বা ৭৯ পেয়েছে। অবশ্য মুক্তি এবং প্রসূন সেটা বিশ্বাস করতে রাজি নয়। স্কুলের ফাইনাল পরীক্ষায় প্রসূন বাংলায় ৯২ পেয়েছিল। তার জেএসসিতে ‘এ+’ না পাওয়ার কোনো কারণ নেই। আর প্রসূন বাংলায় যথেষ্টই ভালো। মুক্তির সিদ্ধান্ত খাতা পুনর্মূল্যায়নের।
আপনারা যারা টুকটাক আমার লেখা পড়েন, তারা জানেন; আমি কখনোই জিপিএ দিয়ে মেধা মাপি না, মানুষকে তো নয়ই। একজন শিক্ষার্থীরা সব বিষয়েই ৮০ শতাংশের ওপরে নম্বর পাবে, এটা আমার কাছে অবিশ্বাস্যই লাগে। সবাই তো সব বিষয়ে ভালো নাও হতে পারে।
তবুও জিপিএ-৫ পাওয়া প্রসূনের জন্য, যারা গোল্ডেন পেয়েছে তাদের জন্য, যারা পায়নি তাদের জন্য, যারা পাশ করেছে তাদের জন্য, যারা পাশ করতে পারেনি তাদের জন্যও অভিনন্দন। জেএসসিতে গোল্ডেন না পেলে বা জিপিএ-৫ না পেলে জীবন মিছে হয়ে যায় না। তবে সবচেয়ে ভালো জিপিএ-৫ পেয়েও যে ছেলে হাউমাউ করে কাঁদে, তার বাবা হিসেবে নিজের জন্য রইলো গ্লানি।
প্রত্যাশার তার আমরা এত উঁচুতে বেধেছি, প্রসূনরা ছুঁতে গিয়ে শৈশব বিসর্জন দিচ্ছে, তারপরও সন্তুষ্ট হচ্ছে না। আমি বরং যারা পড়াশোনা একটু কম করে শৈশবটা উপভোগ করেছে, তাদের হিংসা করছি। পড়াশোনাটা অবশ্যই দরকার। তবে জিপিএ-৫ না পেলেই জীবন শেষ এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। ভালো ছাত্র শুধু নয়, ভালো ও মানবিক মানুষ হিসেবে বড় হয়ে ওঠাটাই গুরুত্বপুর্ণ।
আমাদের সময় প্রথম পাবলিক পরীক্ষা ছিল এসএসসি, এরপর এইচএসসি। ইদানিং এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রাথমিক সমাপনী-পিইসি এবং অষ্টম শ্রেনীর জেএসসি। শিক্ষাবিদ, অভিভাবকরা দীর্ঘদিন ধরেই শিশুদের ওপর থেকে পরীক্ষার চাপ কমানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। অন্তত পিইসি পরীক্ষা বাদ দেয়ার প্রবল দাবি ছিল।
গতবছর এক পর্যায়ে পিইসি পরীক্ষা বাতিলের নীতিগত সিদ্ধান্তও হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব পরীক্ষাই বহাল থাকছে। পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ দুটি পরীক্ষার পক্ষে তার যুক্তি তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রীর যুক্তি অকাট্য। আগে পঞ্চম শ্রেনী ও অষ্টম শ্রেনীতে বৃত্তি পরীক্ষা হতো।
তখন শিক্ষকরা বাছাই করা শিক্ষার্থীদের বৃত্তি পরীক্ষার জন্য তৈরি করতেন। এখন পিইসি ও জেএসসির মাধ্যমে সকল শিক্ষার্থীই বৃত্তির জন্য বিবেচনায় আসছে। তাছাড়া এই পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বাড়ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘এসএসসি পরীক্ষার সময় টেনশনে অনেকের পেট মোচড় দেয়, পেট গুড়গুড় করে, বমি আসে, মাথা ঘোরে।
কিন্তু আগেই বোর্ড পরীক্ষার জন্য তৈরি হয়ে যাওয়ায় এ ধরনের পরিস্থিতি আর হবে না।’ খুবই যৌক্তিক কথা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে পরীক্ষার্থীদের এত খুঁটিনাটি বিষয়ও মাথায় রাখেন, এ জন্য তিনি ধন্যবাদ পাবেন। প্রধানমন্ত্রী যে যুক্তিতে পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষা রাখার পক্ষে বলছেন, তা হলে আপত্তি নেই।
কিন্তু অভিভাবক আর শিক্ষকরা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কাছে পরীক্ষাকে আতঙ্ক হিসেবেই তুলে ধরছেন। যে টেনশন একজন শিক্ষার্থীকে এসএসসিতে নেয়ার কথা, এখন সেটা নিতে হচ্ছে পঞ্চম শ্রেণীতেই। আর আত্মবিশ্বাস বাড়ার বদলে কারো কারো আত্মবিশ্বাস ধ্বংস করে দেয় এই পরীক্ষা। স্কুল-পরীক্ষা-কোচিং-টিচার এই শিশুদের কাছ থেকে শৈশব কেড়ে নেয়। প্রধানমন্ত্রী পিইসি আর জেএসসিকে রিহার্সাল বললেও, অভিভাবকরা একেই মূল পরীক্ষা ধরে সন্তানের ওপর চাপিয়ে দেন অনন্ত চাপ।
নতুন বছরে সরকারের কাছে চাওয়া, তারা যেন আমাদের সন্তানদের শৈশব কেড়ে না নেন। পিইসি আর জেএসসি পরীক্ষা যেন তাদের আত্মবিশ্বাসী করে, যেন আত্মবিশ্বাসকে ধ্বংস না করে। পড়াশোনাটা যেন হয় আনন্দের, আতঙ্কের নয়।
প্রভাষ আমিন
 




সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৬
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
কার্যালয়: কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশন, তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়,কুমিল্লা-৩৫০০, বাংলাদেশ
ফোন: +৮৮০ ৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২৪৪৩, +৮৮০ ১৭১৮০৮৯৩০২
ই মেইল: hridoycomilla@yahoo.com, newscomillarkagoj@gmail.com,  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশান।
তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : hridoycomilla@yahoo.com Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};