ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন অ্যাপস কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য লাইভ টিভি লাইভ রেডিও সকল পত্রিকা যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
ফিরে দেখা
আনোয়ারুল হক ||
Published : Thursday, 5 January, 2017 at 2:26 AM
ফিরে দেখা তৃতীয় পর্ব-চব্বিশ
আজকের এই পর্বটি যখন পত্রিকায় যাবে ততদিনে ২০১৭ নতুনবর্ষ দিনের খাতায় গড়াতে শুরু করবে। মনে পড়ে, এইসব নতুন বছরে অলকার থাকতো একটাই বাসনা। রানিকুটিরের সিঁড়ির শেষ ধাপে জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকবে,সেই সময় আমি থাকবো তার পাশে। সারাদিন ইতিউতি ঘোরাঘুরি, ময়নামতি কোটবাড়ি শালবন বিহার বার্ড ক্যাফেটেরিয়া শেষে শেষ বিকেলে ধর্মসাগরের জলের কাছাকাছি। এইসব সময় কবিতা না ভেবে উপায় আছে!
অলকা কবিতা লিখতো না। কবিতা ভালবাসতো। আর চিঠি লিখতো কবিতার মতো।
সে বছর তো আমি চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ে। অলকা ঢাকায়। কাশ শেষে হলে ফিরে পেলাম সাদা খামে নীল চিঠি। সারা বছরের সালতামামি। বলে রাখা ভাল, অলকার চিঠিতে কোন সম্বোধন থাকতো না।
লিখেছে সে..
“দেখতে দেখতে বছর পার হয়ে গেল। পাহাড়ে জঙ্গলে বাড়ির পাশে নদী খালের তীরে খোলা হাওয়ায় চুল উড়িয়ে মনের আনন্দে বড় হয়েছি। নিজের বাড়ির আশেপাশের বনে-বাদারে গাছের ডালে বানর তাড়াতে তাড়াতে, ওদের পিছনে ছুটতে ছুটতে দিন পার করে দিয়েছি। কোন ভয়-ডর বলে আমার কিছু নেই। কিন্তু আজকাল বড় ভয় হয়। তোমাকে নিয়ে। যে কথাটা তোমাকে বলা হয়নি সেই কথাটা কোনদিন বরা হবে কিনা অথবা বলতে পারবো কিনা জানিনা। নিভৃতে আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করেছি, মন নিরুত্তর থেকেছে। মুখ খোলেনি। ঠোঁট কেঁপেছে। মনে হয়েছে, মনে পড়েছে-
তুমি বাংলা সাহিত্যের ছাত্র। তোমার নিশ্চয়ই সুধীন্দ্রনাথ দত্তের এই কবিতা পড়া আছে. তাই উচ্চারণ করি,
‘একটি কথার দ্বিধা থরথর চূড়ে
ভর করেছিল সাতটি অমরাবতী
একটি নিমেষ দাঁড়াল সরণী জুড়ে
থামিল কালের চিরচঞ্চল গতি।...’
সেদিন তোমার ঘর থেকে চলে আসার সময় মুকিত আমাকে তার বাসায় নিয়ে গিয়েছিল।
সে আমাকে অনেক কথাই বলেছে। সব কথাও তো বলে কয়ে বুঝানো লাগে না।
আমি বুঝেছি।
তবে এটা ঠিক, তোমাকে আমি বুঝি এই দাবি আমি করতে পারি না। যদি তাই হতো তাহলে যা বলতে চাইছি তা খোলাখুলি বলে ফেলতে পারতাম। কোন কোন মানুষের সামনে দাঁড়ালে জানা কথাটাও অনেকে ভুলে যায়। তেমনি একজন মানুষ, তুমি।
নতুন বছরের শুরুতে যে চিঠি তোমার হাতে পড়বে, ভেবেছিলাম, চিরকালের কাংখিত না বলা কথাটা বলবো আজ।
ভেবেছিলাম। এখন ভাবছি, থাক্।
সব কথা কি মুখে বলা যায় ? তুমি ভাল থেকো। ইতি।
এইরকমই ছিল অলকার চিঠির ভাষা।
এরপর আনেকদিন নীল খামে কোন চিঠি আসেনি। ভাবনাটাও বেশিক্ষণ স্থির থাকতে পারেনি, ভার্সিটিতে, হলে নিত্য নতুন ঘটনা ঘটতো তার জন্যে।    
এদিকে, বন্ধু মহসিন এত তাড়াতাড়ি ধপাস করে পড়বে, ভাবিনি। যদিও কুমিল্লা থাকতে তাকে নিষেধ করেছিলাম. হুঁশে থাইকো বাপু, এতো ঊড়াউড়ি করো না’। শোনেনি সে। খুকুর সঙ্গে সময় অসময় ওঠাবসা, গল্পগুজব ঘোরাঘুরি চলছেই। তখন ওরা দু’জন দুজনকে ছাড়া আর কিচ্ছু বুঝে না। আমাকেও একদিন মহসিন নিয়ে গেল খুকুর বাসায়। ড্রইং রুমে ঢুকেই আঁচ পাওয়া গেল ওদের  জৌলুসের ধার। নিশ্চিত হলাম, খুকুর পরিবারের বিত্ত যেমনি আছে তেমনি তার রূপও আছে চোখে পড়ার মতো।
বিচার করতে চাইলাম, কী কারণে খুকু মহসিনকে ভালবাসে বলছে জানি না তবে সব দিক বিবেচনায় এই সম্পর্ক নিয়ে আমার সন্দেহ রয়েই গেল। বন্ধুকে তার নিজের অবস্থা বুঝে পাগল না হওয়ার জন্যে অনেক অনেক রাত তার ঘরে ব্যয় করলাম। কোন লাভ হলো না, তাদের প্রেমের নৌকা উজান বেয়ে চলতেই থাকলো।
আমার সন্দেহ হওয়ার কারণ ছিলো। কেননা খুকু এবং মহসিন এদের দু’জনের মধ্যে আর কিছু না হোক বিত্তের পার্থক্য ছিল বিরাট। খুকু মানুষ হয়েছে প্রাচুর্যের মধ্যে, তার কোন আকাংখা অপূর্ণ থাকে না। আর মহসিন গ্রামের ছেলে। আমি গেছি ওদের বাড়িতে। গৌরিপুর বাস থেকে নেমে নৌকায় এক ঘন্টা যাওয়ার পর দ্বীপের মতো এক টুকরো সবুজের মধ্যে ওদের বাড়ি। সাধারণ কৃষক পরিবারে বাবার একমাত্র ছেলে সে। মা অতি কোমল স্নেহপ্রবণ ছেলে অন্তপ্রাণ।
দেখেছিলাম, সেদিন পূর্ণিমার রাতে চাঁদটা কোন আড়ম্বর ছাড়াই নেমে এসেছিল মহসিনদের মাটির ঘরে। আর তাল মিলিয়ে নদীর ওপর থেকে ভেসে আসা সে কী উথাল পাথাল বাতাস! সুখের কোন অভাব নেই এদের জীবনে তবে শহুরে খুকুদের যা আছে তা এখানে নেই।  প্রাচুর্য, বিলাস এবং অপচয় !
যাই হোক, আমি একাই আলাওল হলে আর কুমিল্লার সহপাঠি বন্ধুরা অন্য হলগুলিতে সিট পেয়ে গেলাম তিন সপ্তাহের মাথায়। মহসিন কোন সিট পেল না। ওর দিন কাটে রাত কাটে আজ এর সিটে তো কাল ওর সিটে। জোবরা গ্রামের মাটিতে থিতু হতে না হতেই এক সন্ধ্যায় খবর এলো, বাস্তুহারা মহসিন ব কাট্টা ঘুড়ির মতো গোত্তা খেয়ে পড়ে গেছে মাটিতে।
‘এই জীবন আর রাখবে না’, বলে আমার আলাওল হলের পিছনে পাহাড়ের চূড়ায় গেছে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করতে!
মহসিনকে বাঁচাবার জন্যে পাহাড়ে পড়িমরি করে ছুটতে ছুটতে শুনলাম আদ্যোপান্ত। রফিক যা বললো,
-কয়েকদিন আগে আমাদের বিভাগের সেলিমের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে খুকুর। গত দুইদিন ধরে খুকু মহসিনকে এড়িয়ে যেতে থাকে। মহসিন প্রথম প্রথম ভেবেছে, অভিমান। আজ সকালে বুঝা গেল তা না, খুকু ওকে কেঁদেকেটে বলেছে, ‘তাকে ভুলে যেতে আর মা করে দিতে’, বলেই নাকি একটু দূরে দাঁড়ানো খুকুর অপোয় সেলিমের হাত ধরে চোখ মুছতে মুছতে চলে যায়।
রফিক আরও যোগ করলো- ‘দোস্ত, মহসিন হয়তো এতা দু:খ পাইতো না, বুঝছো নি, যেই হুনছে সেলিম খুকুরে নিয়া সোহরাওয়ার্দি হলে গিয়া তার রুমে ঢুইকা দরজা লাগাইয়া দিছে, এই হুইন্যা মহসিনের চোখ ছানাবড়া! বুঝছো’ !
বুঝতে বুঝতে চেরাগি পাহাড়ে ওঠলাম। ঝোপে ঝোপে অন্ধকার ঘাপটি মেরে আছে চারিদিকে। নিচে পাহাড়ের পাদদেশ দিয়ে এঁকেবেঁকে যে রাস্তা চলে যেছে তার নাম ‘লাভ লেন”। সেখানে পোস্টে যে বাতি জ্বলছে তার আলো এত উঁচুতে এসে পৌঁছায় না। কিচ্ছু দেখা যায় না, কোথায় খুঁজবো তাকে ? রফিক আর আমি দু’জনে মিলে প্রাণপণে ডাকতে শুরু করলাম, ‘মহসিন, কই তুমি? এই মহসিন’ ?
কোন সাড়া নেই। আমাদের চিৎকার আলাওল হলের পিছনের দেয়ালে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে। ভাবছি, ঝাপ দিল না তো? আর চোখ সয়ে আসা অন্ধকারে ল ল জোনাকীর আলোয় আমরা ওকে এদিক ওদিক খুঁজি। নাই।
এদিকে পাহাড়ি মশাও প্রচুর। বাপের ভা-ার ফতুর করে দিয়ে যা রক্ত কামাই করেছি তার সবই তো বাঘামশা খেয়ে নেবে দেখছি। আবার প্রাণপণে ডাকলাম,
-‘মহসিন, পাহাড় থেইক্যা লাফ দিয়া না থাকলে জবাব দাও। নইলে গেলাম। আর খুঁজতে আসবো না। শিয়াল কুত্তায় তোমারে খাইবো, মনে রাইখো’।
বলতে না বলতেই আশেপাশে একটু দুরে শেয়ালের ডাক শুনতে পেলাম।
এরপরপরই কাছাকাছি একটা ঝোপের আড়াল থেকে ঘোড়ার চিঁহি চিঁহি ডাকের মতো আওয়াজ পেলাম। মহসিনের হৃদয় ভাঙ্গা কণ্ঠস্বর,
-‘আমি এইহানে’।
আওয়াজ শুনে মনে মনে গালি দিলাম, শালার শালা !
কাছে যেতে যেতে কৌতুকের স্বরে জানতে চাইলাম,
-‘ও, তুমি মর নাই এখনো’ ?
ব্যর্থ প্রেমিক হঠাৎ করে আমাদের দেখেই কিনা জোস নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। হাত তুলে নায়ক রাজ্জাকের মতো চিৎকার করে ওঠলো,
-‘খবরদার, কাছে আসবা না তোমরা। আমি মরতে চাই’।
অমি রফিকের হাতে ধরে চাপ দিলাম। আস্তে করে বললাম,
- ‘ও মরলে আমরা আসার আগেই ঝাঁপ দিত। তোমারে দিয়া খবর দিত না। কেউ মরতে গেলে পাড়া পড়শিরে জানাইয়া মরতে যায় না’।
তারপর মহসিনকে বললাম,
-‘শোন, আমরা তোমারে বাঁচাইতে আসি নাই। শুধু দেখতে আসছি, মরছো কিনা’!
এইসব বলতে বলতে আমরা ওর কাছে যাই। তারপর সে কিছু বুঝার আগেই তাকে দু’জনে মিলে চ্যাংদোলা করে ধরে তার ওপর মনের ঝাল মুখে ঝাড়তে ঝাড়তে পাহাড় থেকে নেমে আসি।
মহসিন চিৎকার করে,
-‘আমাকে ছেড়ে দাও, আমি মরতে চাই...’
আমরা দুই পাষ- ব্যর্থ প্রেমিকের শেষ ইচ্ছায় কোন কর্ণপাত করলাম না। ঐ ভাবেই তাকে আমার ১১৮নম্বর কে এনে বিছানার ওপর ফেলে দিয়ে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে ক্যান্টিনের দিকে ছুটলাম। নিয়মিত আড্ডায়।
হলের পিছনে এডমিন বিল্ডিংয়ের পাশের ক্যান্টিনে ঢুকতেই টিনের প্লেট, গ্লাশ চামচ বাজিয়ে গান গেয়ে আমাকে অভ্যর্থনা জানালো সবাই,
-‘তিন দিন তোর বাড়িত গেলাম দেখা পাইলাম না বন্ধু তিনদিন..’
আড্ডা শেষে রাত এগারটার দিকে হলে ফিরতে ফিরতে আশু আমাকে বললো,
-‘আনু, ওর সঙ্গে কথা হয়েছে তোমার’ ?
দম বন্ধ করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে সে। বললাম,
-‘কাল বিভাগের সামনে এসো। মিলিয়ে দেবো’।
আশু এস এম হলে ফিরে যাচ্ছে। আমি তাকিয়ে ছিলাম, দেখলাম,
-প্রেমে পড়লে মানুষ আর ফুলের ওপর ঘুরতে থাকা প্রজাপতির মধ্যে কোন পার্থক্য থাকে না !
(চলবে)
০৫.০১.২০১৭  
প্রফেসর (সাবেক),বাংলা বিভাগ, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ, কুমিল্লা।
০১৭১৫১২৭০৪৪




সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৬
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
কার্যালয়: কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশন, তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়,কুমিল্লা-৩৫০০, বাংলাদেশ
ফোন: +৮৮০ ৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২৪৪৩, +৮৮০ ১৭১৮০৮৯৩০২
ই মেইল: hridoycomilla@yahoo.com, newscomillarkagoj@gmail.com,  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশান।
তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : hridoycomilla@yahoo.com Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};