ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন অ্যাপস কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য লাইভ টিভি লাইভ রেডিও সকল পত্রিকা যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
যে স্মৃতি ধূসর হয়নি
শওকত আহসান ফারুক ||
Published : Wednesday, 4 January, 2017 at 1:49 AM
যে স্মৃতি ধূসর হয়নি১০.
অরন্যপুর
আমাদের একটা নদী আছে একান্তই আমার, নাম গোমতী।
কুমিল্লা শহরের উত্তর পূর্ব দিক দিয়ে বয়ে গেছে।
বর্ষায় খরস্রোতা, প্রমত্তা, উত্তাল কোন বিশেষণ দিয়ে বলা যায় না, গোমতী শুধুই গোমতী।
কুমিল্লার আনন্দ, কুমিল্লার দুঃখ, আমাদের প্রিয় নদী।
রচনায় লিখি কুমিল্লা গোমতী নদীর তীরে অবস্থিত।
ত্রিপুরা ডুমিরিয়া গোমতীতে উৎপত্তি, সেখান থেকে কুমিল্লার গোলাবাড়ি দিয়ে, এসেছে মিষ্টি মেয়ে গোমতী,পায়ে নূপুর, রিনি ঝিনি। কুমিল্লা শহর ছুঁয়ে চলে, ময়নামতি, কোম্পানীগঞ্জ, মুরাদ নগর, গৌরীপুর হয়ে দাউদকান্দি। সেখানেই মেঘনার সাথে দেখা,  কুমিল্লার নদী, পূর্ব থেকে পশ্চিমে দিয়েছে পাড়ি। নদী ও নদী পাড়ের মানুষের সুখ দুঃখ নিয়ে, আমাদের যাপিত জীবন, আমাদের গল্প কবিতা।
কুমিল্লার নিঃজস্ব নদী গোমতী।
একটা আতঙ্ক কুমিল্লা বাসীর ভেতর থাকে বর্ষায়, বেশ বৃষ্টি হচ্ছে ক'দিন, বৃষ্টি হচ্ছে ত্রিপুরার পাহাড়ে, অবিরাম, জল ছুঁয়েছে বিপদ সীমা, যে কোন সময় বাঁধ ভাঙ্গতে পারে। শহর প্লাবিত হবে, ঘর বাড়ি ডুবে যাবে।
শৈশবে একবার বাঁধ ভেঙ্গে ছিলো, আমি তখন অনেক ছোট, আমরা শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যাই, কিছুটা মনে আছে।মোটরগড়িটা শাসনগাছা থেকে ময়নামতি পর্যন্ত পানি ভেঙ্গে ভেঙ্গে সাঁতার কেটে গিয়েছিলো।
সবাই দল বেঁধে কালিয়াজুরি যাই, হজরত অইনুদ্দিন শাহ্ মাজার, পিটিআই স্কুল পার হয়ে গোমতীর বাঁধ, আনেক উঁচু। পানির উত্তাল স্রোত সেদিন দেখেছি, বাঁধের উপর অনেকেই আশ্রয় নিয়েছে। হাজার হাজার বালির বস্তা দিয়ে, প্রোটেকশন দিচ্ছে। আকাশে মেঘ জমেছে, আরো বৃষ্টি হবে, পানি ফুলে ফেঁপে উঠছে যে কোন সময় বাঁধ ভাঙ্গতে পারে।
শহরে মাইকিং চলছে, নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাবার জন্য।
কালিয়াজুরিতে বাঁধে ফাটল ধরেছে, বৃষ্টি হচ্ছে  আকাশে কালো মেঘ। তখোন দুপুর গড়িয়ে বিকেল, রাতে যদি বাঁধ ভাঙ্গে সমূহ বিপদ। প্রশাসন, আর্মি, পুলিশ ও সিভিল ডিফেন্স সবাই ব্যতিব্যস্ত। আজ বুঝি বাঁধ ভাঙ্গবেই, কিভাবে ঠেকানো যায়।
দেখছি হাজার হাজার বালির বস্তা দিয়ে ভাঙ্গন রোধ করার আপ্রাণ প্রচেষ্টা, মানুষের উৎকন্ঠা, উদ্বেগ এখনি বুঝি ভাঙ্গবে বাঁধ, সারা শহর ডুবে যাবে, প্রিয় নদী গোমতী ভাসিয়ে নিয়ে যাবে, আমার প্রিয় শহর, আজ গোমতী প্রমত্তা, পাহাড়ী কন্যা তোমাকে রুধিবে কে।
এমন সময় খবর এলো, গোমতীর বাঁধ ভাঙ্গছে, অরণ্যপুরে। পূর্ব দিকে প্রায় দুই মাইল দূরে অরণ্যপুর, আমরা তখন বাঁধের উপর। সবার মনে কিছুটা স্বস্তি এলো, শহরটা তো রা পেলো।
এবারও হজরত আইনুদ্দিন শাহ্ কুমিল্লাকে বাঁচালো।
অরণ্যপুরে পানির চাপ আরো বেশি তাই সেখানেই বাঁধ ভেঙ্গেছে। ব্যপারটা তা নয়, শহরকে রা করার জন্য, বিকল্প ব্যবস্থা, ডিনামাইট দিয়ে অরন্যপুরে বাঁধ ভেঙ্গে দিয়েছে, সবাই আশ্বস্ত, হলো কুমিল্লা শহর রা পেলো।
আমাদের প্রিয় নদী, মিষ্টি মেয়ে গোমতী।
#
বার পাখিয়ার নীল কুঠি
দ্রুতপঠনে একটা গল্প ছিলো, বার পাখিয়ার নীল কুঠি।
আমাদের প্রধান শিক তাসাদ্দুক হোসেন লোহানী স্যারের লেখা। দারুণ সৌম্য পুরুষ, দ প্রশাসক, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সহিত্যে এমএ।
আমাদের প্রিয়, প্রধান শিক আবদুর রশীদ স্যারের অভাবটা, মিটিয়ে দিয়েছেন, অল্প কদিনের মাঝে।
আমাদের একটা গর্ব, আমাদের স্যারের লেখা সবার পাঠ্য।
কোন অহংকার ছিলো না, ঠান্ডা মেজাজ।
নুর আহম্মদ খান সহকারি প্রধান শিক সপ্তাহে একটা কাশ, বাংলা দ্রুতপঠন। দ্রুতপঠনে ছিলো কতগুলি গল্প ও নাটক। স্যার গল্প পড়ানোর চাইতে, সাহিত্যের বেসিক ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করেছেন, বছরব্যাপি।
সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা প্রশাখার ব্যাখ্যা করেছেন।  নাটক, ছোট গল্প, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ ইত্যাদি নিয়ে বিশদ  আলোচনা।
নীল দর্পণ বাংলায় প্রথম নাটক, দীনবন্ধু মিত্রের জীবন চরিত। নাটকের  পটভূমি নীল চাষ কিভাবে হতো।
নীল যে একটা ফসল তা জানতে পারি, সেই কাশে। সারা বিশ্বে নীলের চাহিদা ও ব্যবহার, নীল কর সম্পর্কে অবগত হই।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
মহেশ গল্পটা পাঠ্য ছিলো, ছোট গল্প কি, কাকে বলে কোনটা সার্থক গল্প এইনিয়ে আলোচনা।
বিন্দুর মাঝে সিন্ধুর গভীরতা, শেষ হইয়াও হইলো না শেষ, কথা গুলো স্যারের কাছ থেকে জানা।
শরৎচন্দ্রের জীবন বোধ, মুসলমান সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে শরৎচন্দ্রের অসচ্ছ ধারণা নিয়ে, বিশদ আলোচনা, সাহিত্যের
বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ দারুণ ভাবে আমাদের আলোড়িত করেছিলো, সেই সময়ে।
একজন শিকের কাছে আমাদের এই শিা, সাহিত্যের গাঁথুনি, আমাদের আজীবন পাথেয়।
#
জীবনের ল্য
তোমার জীবনের ল্য কি।
অরস রহ ুড়ঁৎ ষরভব.
রচনাটা প্রায়ই আসে, বাংলা ও ইংরাজিতে, এটাই লিখছি প্রতিবার।
কখনো ডাক্তার হয়ে মানবতার সেবা করবো, কখোনো লিখেছি,
( ডাহা মিথ্যা) মায়ের মৃত্যুর সময় ডাক্তার পাইনি তাই ডাক্তার হবো।
ইঞ্জিনিয়ার হয়েছি, হয়েছি আধুনিক কৃষক।
ওকালতি পাশ করে রাজনীতি করার ইচ্ছাও পোষণ করেছি। দেশের সেবা করবো, সমাজ ব্যবস্থা ঢেলে সাজাবো, কত কি হয়েছি।
আসলে যা হয়েছি সেই রচনাটা কখনো লেখাই হয়নি।
একটা মেয়ে 'ফয়জুন্নেসা গার্লস স্কুলের' কাশ নাইনে রচনাটা পরীার খাতায় লিখেছে, ঠিক এইভাবে।
আমার জীবনের ল্য
প্রত্যেক মানুষের জীবনেই ল্য থাকে। ল্যহীন জীবন কান্ডারীবিহীন তরীর মতো, তাই জীবন গঠনের প্রাক্কালে ল্য স্থির করাই সঠিক। অতি সাধারণ বাঙালি মেয়ে আমি। তবে দেখাশুনায় মন্দ না, বুঝেছি পাড়ার ছেলেরা আমাকে ল্য করে বলে। ফুল নিয়ে হাঁটে, আকারে ইঙ্গিতে বলে ভালোবসি।
পড়াশুনায়ও ভালো, কখনো ফেল করিনি, চিঠি পত্র লিখতে পারি মনের মাধুরী  মিশায়ে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়র, শিক আনেক কিছুই হবার ইচ্ছা আছে, লিখে কি লাভ, যা হবার নয়। সবার স্বপ্ন তো ডানা মেলে না, আমি তো সাধারণ, মধ্যবিত্ত। আমার এতো সুখ সইবে কেন, তাই লিখলাম না।
মা বলেছে, ম্যাট্রিক পাশ করলে বিয়ে দিয়ে দেবে।
হায়রে নিয়তি, আমার আবার জীবন, মেয়ের জীবন, তার আবার ল্য। পুতুলের মতো বেঁচে আছি। জলের মতো, যেই পাত্রে রাখো সেই রূপ ধারণ করি, অভাগীর জীবনের একটাই ল্য।
যেন সৎ পাত্রে পাত্রস্থ হই।
জানিনা মেয়েটা সৎপাত্র পেয়েছিলো কিনা।
#
নেপাল
সবার মুখে একই কথা, কোটবাড়িতে সিনেমার শুটিং যেতেই হবে। চিত্রালীতে খবর এসেছে। 'কারওয়া' সিনেমার ইউনিট এখন কোটবাড়ি লালমাই পাহাড়ে, লোকেশান
শবনম ও হারুণ নায়ক নায়িকা, ঢাকার তখন নিয়মিত উর্দু ছবি তৈরি হয়, পশ্চিম পাকিস্তানে উর্দি সিনেমা অনেক বড় বাজার। আমিও যাই, কয়েক জন বন্ধু সহ, আনেক দূর শালবন পেরিয়ে আরো গহীনে, সেখানে কখনো যাইনি, এতো সুন্দর জায়গা আমাদের কুমিল্লায় আছে কে জানে।
কাছ থেকে স্বপ্নের কোন নায়ক নায়িকা দেখা, সেদিন প্রথম।
শবনমকে সিনেমায় দেখেছি, হারুণকে দেখিনি। ক্যামেরা, রোলিং, কাট, এ্যাকশন দেখার পর বুঝলাম, গানের দৃশ্য চিত্রায়িত হচ্ছে। চায়ের বাক্স দিয়ে বানানো রিফেকটর। , মেকআপ করে ছাতা মাথায় দাড়িয়ে শবনম, সবাই ব্যস্ত।
মুভি ক্যামেরা প্রথম দেখি, ৩৫ মিলিমিটারে টেক হচ্ছে।
পরিচালকের চোটপাট, প্রডাকশনের হাঁকডাক। পর্দায় আমরা  যা দেখি তার সাথে শুটিংয়ের কোন মিল নেই।
বেশ কয়েক দিন ইউনিট কোটবাড়ি ছিলো। কুমিল্লার কয়েক জন তাদের সহযোগী হয়ে গেলো।
নঈম মামু তাদের অন্যতম শহরের সেরা এন্টারটেইনার, ছয় ফুটের বেশি লম্বা কলো ছিপছিপে, নঈমুর রহমান, সবাই ডাকে নঈম মামু, সবার প্রিয় মুখ। সাথে আছে আরো বেশ কয়েক জন। সবার সহযোগিতায় ছিমছাম ভাবেই লোকেশনে শুটিং চলছে।
একটা মজার ঘটনার কিছুটা মনে আছে। নামটা মনে নেই কেউ একজন, একটা কাগজ ও কলম হাতে দিয়ে, আমাদের কাউকে বললো যাও, ঐযে ম্যাডামকে দেখছো তিনিই শবনম, কাছে গিয়ে, ম্যাডামকে আমার কথা বলবে,শবনমের ফুলএড্রেসটা নিয়ে আসো, আমি বলে দিচ্ছি, গেলেই দিয়ে দেবে। ঠিকই কাগজ কলম হাতে সে গেল, সামনে শবনম দেখে টোটালি নার্ভাস। কি বলবে বেমালুম ভুলে গেলো, শবনমের সামনে।
কি চাও খোকা?
ম্যাডাম উনি আপনাকে, আপনার ড্রেসটা দিতে বলেছেন।
কি বলো, ড্রেস চাইবে কেন, কে?
হাত দিয়ে দেখিয়ে দিলো, উনি চাইছে, শবনম ও ওদিকে তাকালো। জোরে বললো আরে ফুল এড্রেস, ফুল এড্রেস।
জানিনা কি বুঝলো,মনে পড়ছে, আপনার  ফুল ড্রেসটা চেয়েছে। শবনম হতবাক, বলে কি। এদিক থেকে প্রম্পট করছে ফুল এড্রেস।
ম্যাডাম, ফুল ড্রেসটা চাইছে বলে কাগজ কলম এগিয়ে দিলো।
কারওয়া, সিনেমাটা কোথায় কেমন চলছে বলতে পারবো না। তবে কন্দিরপাড়ে লিবার্টি হলে আনেকদিন চলছে।  সিনেমাটা দেখে আমরা তো হতবাক। কোথায় কুমিল্লা  লালমাই, কোটবাড়ি কোথায় নেপাল। সিনেমার গল্পে লোকেশনটা ছিলো নেপাল।
#
নাম্বার টেন, সুচিত্রা সেন।
ইয়েস অন সুচিত্রা সেন, ওনলি ওয়ান লাকি পারসন।
মেলায় হউজি চলছে। কল করছেন খালেক ভাই, একটি পরিচিত কন্ঠস্বর, একটি বিশ্বাস।
কালো মানুষটা, পরিপাটি করা চুল, আয়রন করা সার্ট পরনে লুঙ্গি।
হ্যালো মাইক্রোফোন টেস্টিং ওয়ান, টু, থ্রি...।
শুনলেই টের পাই খালেক ভাই আসছে, নতুন কোন সিনেমার সংবাদ নিয়ে।
ঞযব ঢ়রঃ ধহফ ঃযব ঢ়বহফঁষঁস.
ঞযব ঢ়রঃ ধহফ ঃযব ঢ়বহফঁষঁস
রূপকথা সিনেমায় চলিতেছে,  সর্বকালের সেরা ভয়াবহ, সাসপেন্স।
বিখ্যাত ২ এর পাতার পর।।
উপন্যাস ঊফমড়ৎ অষষবহ চড়ব'ং, ঞযব চরঃ ধহফ ঃযব ঢ়বহফঁষঁস.
ঞযব এৎবঃবংঃ ঞবৎৎড়ৎ ঞধষবং ঊাবৎ ঞড়ষফ.
রিক্সায় লাগোনো পোষ্টার দেখতেই সাসপেন্স।
এতো টান টান উত্তেজনা, শ্বাস রুদ্ধকর অবস্থা ভয়, কি জানি কি হয়। সিনেমাটা মনে দাগ কেটেছে।
মাইক্রোফোনে খালেক ভাই, সবার চেনা কন্ঠ।
কন্ঠস্বর যে মনুষে মনে আস্থা আনে, খালেক ভাইয়ের মাইকিং তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। খালেক ভাই বলেছে, এটাই সঠিক। সিনেমার ডায়লগ দিয়ে, গান শুনিয়ে, লিফলেট বিলিয়ে খালেক ভাই চলছে।
ছোট শহরে আনন্দ, বিনোদন, সিনেমা, মেলা।
হাউজিতে খালেক ভাইয়ের কল যেন মাদকতা, নেশার মতো।
সেই সময়ে প্রায়ই ঝড় হতো ভয়বাহ, আকাশের হাবভাব ভালো না, ক'দিন বৃষ্টি হচ্ছে নদী বন্দরে ৯ নম্বর বিপদ সংকেত। সে কথাও খালেক ভাই জানিয়ে গেলো।
কাল সারারাত ঝড় হয়েছে, আমাদের ছিলো টিনের ঘর, টের পাওয়া যেত, শন্ শন্, রিম ঝিম, বাতসের দাপটে রাত  জেগে থাকা। গাছ পালা ভেঙ্গে পড়ে, বুককাঁপে ভয়ে।
বাদুর তলার বড় অশ্বত্থটা সেদিন ঝড়ে লুটিয়ে পড়েছে।
কল দিচ্ছে খালেক ভাই, সুইট, সিক্সটিন। উল্টা পাল্টা, সিক্সটি নাইন।
নাম্বার টেন, সুচিত্রা সেন। ইয়েস্ অন্ সুচিত্রা সেন।
খালেক ভাইয়ের প্রতিষ্ঠানের নামটাও দারুণ, যোগাযোগ।
এখনি বলবে, খালেক ভাই, হ্যালো মাইক্রোফোন টেষ্টিং, ওয়ান টু থ্রি...।
#
কাজুবাদাম
হেড মৌলভী ইয়াকুব আলী স্যারের কাশ। কৃষি বিজ্ঞান, তেমন কিছু পড়াবার নেই, স্যার শুধু দিনের পড়াটা সবাইকে দিয়ে, রিডিং পড়াতেন, ঝিমিয়েই কাটাতেন ৪৫ মিনিট, একজনের রিডিং শেষ হলেই  কলতো নেক্সট।
তাই দুষ্টামির সুযোগ ছিলো বেশি, মাঝে মাঝে টেবিলে ডাস্টার মেরে বলতো চুপ।
আবু আয়ুব হামিদ, আর বেলায়েত ছিলো বেশি টকেটিভ, তাই বছরব্যাপি শাস্তি বরাদ্দ হলো,  স্যারের কাশে টেবিলের দুই পাশে, দুই জনের নিলডাউন।
স্যার কাশে এসেই ঈঙ্গিত দিতেন, দু' জনে চলে যায় নিলডাউনে,
আয়ুব ডানে বেলায়েত বামে।
একদিন আয়ুবের নজরে এলো, স্যার যখন ঝিমায় তখন স্যারের পাঞ্জাবির পকেট থেকে কিছু নিয়ে খায়, শব্দ না করে।
আয়ুব ঈঙ্গিতে বেলায়েতকে বলে দোস্ত কি খাস্?
বেলায়েত ভীষণ চালাক বাড়ি নোয়াখালি,  কিছুই বলে না খায় খুঁটখাট।
পরের দিন স্যার কাশে আসার সাথে সাথে, আয়ুব চট জলদি, বামে নিজেকে প্লেইস করলো, বেলায়েত বাধ্য হয়ে ডানে, স্যারের ঈশারার আগেই।
বডি লেঙ্গুইজে বেলায়েত আয়ুব কে বলছে তুই এদিকে আয়। আয়ুব অনড় আজ দেখবে বেলায়েত কি খায়। স্যার বলছে ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে নেক্সট।
আয়ুবের হাত স্যারের পকেটে, বের করে দেখে কাজু বাদাম। কয়েকটা খাবার পর আবার পকেটে যেইনা হাত, স্যার বলেছে নেক্সট। বেলায়েত স্যারের ডান দিকের পাঞ্জাবি ধরে দিলো টান। স্যার সম্ভিত ফিরে পেলেন। আয়ুবের হাত তখন পকেটে, হাতে নাতে কট। এদিকে আমরা সবই ফলো করছি,
স্যার রেগে আগুন, মকবুল, বেত নিয়ে আয়।
এ ব্যপারে ক্যাপ্টিন মকবুল একপায়ে খাড়া, বলতে দেরি নাই বেত নিয়ে হাজির।
স্যারের ডান হাতে ব্যথা ছিলো, খুব জোরে মারতে পারেনি।
তবে যা ঘটেছিলো দু'জনের ভাগ্যে।
সারা বছরের নিলডাউনের সাজাটা মাফ হয়ে গেলো।
#
আনন্দ ফার্মেসী
ডাক্তার দিনেশ রাউত হোমিওপ্যাথ।
আমার দ্বীতিয় জন্মের ঈশ্বর। ভূমিষ্ঠ হবার পর থেকেই সাথে আছেন।
আমি নানা বলে সম্বোধন করি, নানা আমাকে স্নেহ করে বলেন ' ছাগল'। জ্বর, হাচি কাশি যে কোন উপসর্গ, চলে যাই কান্দিরপাড়ে, 'আনন্দ ফার্মেসি' কাগজের পুরিয়ায় মিষ্টি ওষুধ। প্রথম প্রথম বাবার সাথে গেলেও এখন একাই যাই।
প্রথমেই চোখ দেখে, তারপর জিহবা, কানে স্টেথিস্কোপ লাগিয়ে বুক পিঠ ধরে বলে জোরে শ্বাস নে ছাগল,
কখন থেকে জ্বর, মুখে রুচি আছে, বমি ভাব হয়?
সব শুনে বিধান লিখে দিলেন, সেই যাদুর বাক্সটা খুলে, একটা ছোট শিশি বের করে বললেন হা  কর, দুই ফোটা ওষুধ জিহবায়, জল খাবি, শাগুদানা দুই বেলা।
নিয়ম করে, ৬ ঘন্টা পর পর ওষুধ, গায়ের তাপ বাড়লে মাথায় জল। জ্বর না কমলে জানাবি।
ভীষণ আদর করে বলতো, ছাগল, সেদিন আমি হাটখোলা না গেলে....
একদিন একাই গেলাম বোধহয় ঠান্ডা কাশি ছিলো। ভালো করে আমাকে পরখ করে, একটু হাসলো।
তোকে তো আর ছাগল' ডাকা যাবে না রে, তোর গলার স্বর ভেঙ্গে গেছে,
তুই বড় হয়ে গেছিস্।

আনন্দ ফার্মেসি থেকে আনন্দের সন্দেশটা পেয়ে, একটু শিহরিত হলাম।
ডাক্তার দিনেশ রাউত আমাকে আজ, অন্য ভুবনের ঈশারা দিলো। কিছু কিছু শরীরী স্বাদের, বোধের কথা মনে পড়লো।
সেই প্রথম প্রহর থেকে দীর্ঘ পথ বেয়ে আছি দিনেশ রাউতের সাথে।
#
আলীবাবা
চকবাজারে রূপালী সিনেমায় চলিতেছে, 'আলীবাবা ৪০ চোর'। আরব্য রজনীর গল্প। হিট ছবি ব্ল্যাকে টিকেট কাটতে হলো।
সিসিম ফাঁক।
একটা বাংলা গান বোধ হয় ছিলো, মর্জিনার কন্ঠে।
' মার ঝাড়ু মার, ঝাড়ুমেরে ঝটিয়ে বিদায় কর।
স্কুলের উত্তরে ছিলো একটা প্রাচীন অশ্বত্থ টিলার উপর। হাফটাইমে এখনেই চলতো আমাদের আড্ডা। ৪০ চোরের গল্পই চলছিলো।
এমন সময় সিনিয়র হাবিব ও সেলিম ভাই বললো। (রেসকোর্সের সবাই আমাকে ভাগিনা ডাকে)।
ভাগিনা বলতে পারবি জোরে,
আমি বললম কি?
আলীবাবা, মর্জিনা কই।
পারবো।
তাহলে বল্, কাল তোকে সিনেমা দেখাবো, আমি জোরে বললাম।
আলীবাবা, মর্জিনা কই।
আলীবাবা, মর্জিনা কই।
বাস আর যাই কোথা, নুতন একজন টিচার আমাকে  ডাকলেন এদিকে আসো। এগিয়ে গেলাম,
কোন কাশে পড়ো, নাম কি?
শওকত আহসান ফারুক, সেভেন - এ।
স্যারের মুখে দেখি আলীবাবার মতো দাড়ি, হুম" বলে চলে গেলো নামাজ পড়তে মসজিদে। সবাই উৎসুক হয়ে তাকিয়ে আছে, চুপ কোলাহল নেই।
স্যার চলে যেতেই টিলায় উঠি।
মামা ব্যাপারটা কি?
কিছু না, নুতন টিচার কিছু হবে না।
কাশ টেনএ ইংরাজি গ্রামার পড়ান,  কবিরউদ্দিন আহম্মেদ, আলীবাবার চেহরার সাথে মিল আছে বলে, নাম হয়ে গেলো আলীবাবা।
এ'কথা আমার জানা ছিলো না।
রাজকুমার ঘন্টা বাজায়, কাশে যাই। দপ্তরি নোটিশ নিয়ে এলো, আমাকে ডাকছে, টিচার্স রুমে। আমার সিসিম ফাঁক, চলি দপ্তরির পেছনে পেছনে। ভয়ে বুক কাঁপছে, অন্য টিচার সবাই আমাকে চিনে।
কবির স্যার বললেন, তোমার পিতা কি করেন?
শিক, ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়ান।
একজন শিকের ছেলে হয়ে, তুমি শিককে টিজ করছো?
স্যার আমি কোন টিজ করি নাই, আমাকে বললো ' আলীবাবা, মর্জিনা কই' বলতে পারলে, রূপালীতে রবিবারে সিনেমা দেখাবে।
এর বাইরে আমি কিছুই জানিনা,
ভুল হয়ে গেছে, মাফ করে দিবেন।
আমার সরল স্বীকারোক্তি স্যারের মনঃপুত হলো।
রাগ গিয়ে পড়লো সিনিয়রের উপর।
#
ন্যারেশান
ঠড়রপব পযধহমব, ধপঃরাব ঃড় ঢ়ধংংরাব াড়রপব. ংযধষষ, রিষষ
নিয়ে এমনিতে হিমসিম খচ্ছি।
ঘধৎৎবঃরড়হ নিয়ে পেরেশান, এ্যাসিস্টেন্ট হেড মাস্টার পরিচয় করে দিলেন, ইনি কবিরউদ্দিন আহমাদ, তোমাদের ইংরাজি ২য় পত্র পড়াবেন। আমার দিকে একটু আড় চোখে তাকালেন।
আমি কুমিল্লায় নুতন এসেছি, পরিবার থাকে গ্রামের বাড়ি।
তোমাদের পরিচিত যদি কারো বাসা থাকে, জানাবে। বলেই,
ঘধৎৎবঃরড়হ পড়াতে শুরু করলেন।
দারুণ মেজাজ বেত ছাড়া কথা বলে না। আমি ইংরাজিতে একটু কাঁচা। এবার আর রা নেই।
সেবারই আমাদের স্থান সংকুলানের জন্য, বাসায় খ টাইপের একটা টিনের ঘর, সমনের দিকে নুতন করে তৈরি হয়েছে।
পুরনো ঘরটা মাত্র খালি,কারো সাথে আলাপ না করেই বলে দিলাম, স্যার আমাদের একটা ঘর খালি আছে, বাসা ঝাউতলা। বাসায় এসে বাবাকে বলি, আমাদের একজন নুতন ইংলিশ টিচার এসেছে বাসা পায়না। আমি বলেছি আমাদের বাসা খালি আছে। বাবাকে হা বা না বলার কোন সুযোগ দেইনি।
সেদিন সন্ধ্যায় স্যার চলে এলেন, বাসা দেখে পছন্দ হলো। বাবা বললেন, একমাস পরে উঠেন ঠিকঠাক করতে হবে। ৩৫ টাকা ভাড়ায় কবির স্যার এখন ঝাউতলায়।
স্যারের আলীবাবা নামটা কখনো ঘুচেনি।
আমার ন্যারেশানের পেরেশানি  দূর হলো। সবাই কে মারলে ও আমাকে মারেনা। শুধু বলে, ভুইয়ার পুত্ মন দিয়ে লেখাপড়া করো।
#
টাউন হল
কুমিল্লার কেন্দ্রস্থল কান্দিরপাড়ে টাউন হল।
হর হামেশা টাউন হলে অনুষ্ঠান হয়, থিয়েটার, নাটক, ভ্যারাইটি শো। শিল্প সাহিত্য শিায় কুমিল্লা, অনেক এগিয়ে, প্রাচীন জনপদ। আজ টাউন হলে ফাংশান আছে, পাশের বাসার খোকন ও আমি চলে যাই। খোকনের বোন আমার সহপাঠী, প্রাইমারিতে পড়েছি। গান শিখে, পাশের বাসার বেবী শিরিন সুলতানা আরো অনেকেই গান শিখে ও গায়।
মঞ্জু মাসির মেয়ে অরুনির গান শুনে আমার ভোরহয়।
সন্ধ্যা সাতটায় শো, আগেই যাই, টাউন হলে ঢুকে যে জিনিসটা প্রথমেই নজর কাড়ে, ডান দিকের বিরাট অয়েল পেইন্ট পোর্ট্রড। রাজা বীর চন্দ্র মানিক্য বাহাদুর, মাথায় রাজ মুকুট কোমরে তলোয়ার, নগর মিলনায়তনের প্রতিষ্ঠাতা, ত্রিপুরার রাজা।
দারুণ জাকজমক।
এসব অনুষ্ঠান কখনো সময় মতো শুরু হয়না, কিছু টেকনিক্যাল ডিফিক্যালটি রয়ে যায়। তবে সাড়ে সাতটায় শুরু হয়েছে। কিছু বক্তৃতা তারপর মুল অনুষ্ঠান। এবার আপনাদের সামনে গাইবেন,আপনাদের প্রিয় মুখ।
নাসির আহমেদ।
বলতেই মুহুর্মুহু হাততালি, বুঝলাম সবাই চিনে।
প্রথমেই গাইলো হেমন্তের সেই সাড়া জাগানো গান।
' কোনো এক গাঁয়ের বধূর কথা তোমায় শোনাই শোন
রূপকথা নয় সে নয়, জীবনের মধু মাসে
কুসুম ফোটার গাঁথা মালা,কাহিনী শোনাই শোন'।
নাসির ভাইকে চিনি শিরিনকে গান শেখায়, গানও শুনেছি।
কিন্তু মাইক্রোফোনে অসাধারণ।
তবলায় শেফাল'দা, কি যে কম্বিনেশন সবাই মুগ্ধ।
ওয়ান মোর, ওয়ান মোর অডিয়েন্স থেকে। কেউ বলে রানার,
কেউ বলছে মান্না দে।
হাত তুলে অত্যন্ত সুন্দর করে হেসে সবাই কে আশ্বস্ত করলেন, হারমোনিয়ামে হাত দিলেন, শেফাল'দাকে ঈশারা দিয়ে, ধরলেন।
'রঙ্গিনি কত মন, মন দিতে চায়, কি করে বোঝাই কিছু চাইনা, চাইনা, চাইনা,
সন্দেহে ভরা থাক, তোমার দু'চোখ, আর কারো চোখে আমি চাইনা, চাইনা চাইনা'।
মান্না দের গাওয়া, তমুল হাততালি, আবার ওয়ান মোর। করজোড়ে মিনতি করে বললেন, আরো অনেকে গাইবে, ধন্যবাদ। পরের  গায়িকার নামটা মনে নেই দারুন সুস্রী, গানটা এখনো ভাসছে। গীতা দত্তের গাওয়া।
' নিশিরাত বাঁকাচাঁদ আকাশে
চুপি চুপি বাঁশি বাজে বাতাসে, বাতাসে...'
পর্দা নামলো, এবার আপনাদের সামনে নৃত্য পরিবেশন করবেন। কুমিল্লার গৌরব আমাদের অহংকার, নামটা ভুলে গেছি। প্রায় দশ মিনিট সময় পর পর্দা খুললো, রংগীন সবকিছু অন্ধরার থেকে আলোতে উত্তরণ।
'এসো শ্যামল সুন্দর আনো তব তিশা হারা তপ হারা সঙ্গ সুখে বিরোহিনী '
গানের সাথে নাচ, লাইটিং সব মিলিয়ে আমাদের অভিভুত করেছে।
দারুণ নেচেছিল স্বপ্নের পরী যেন। (চলবে)




সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৬
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
কার্যালয়: কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশন, তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়,কুমিল্লা-৩৫০০, বাংলাদেশ
ফোন: +৮৮০ ৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২৪৪৩, +৮৮০ ১৭১৮০৮৯৩০২
ই মেইল: hridoycomilla@yahoo.com, newscomillarkagoj@gmail.com,  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশান।
তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : hridoycomilla@yahoo.com Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};