ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন অ্যাপস কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য লাইভ টিভি লাইভ রেডিও সকল পত্রিকা যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
বিচিত্র মানুষের অদ্ভুত চরিত্র
শান্তিরঞ্জন ভৌমিক ||
Published : Tuesday, 3 January, 2017 at 1:48 AM
বিচিত্র মানুষের অদ্ভুত চরিত্র আমার জ্যেষ্ঠ সহকর্মী আ.ফ.ম সিরাজ-উ-দৌল্লা ছাত্র বয়সেই কবিতা লিখতেন এবং জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশের জন্য পাঠাতেন। মাঝে মাঝে তাঁর কবিতা ছাপানো হতো, অধিকাংশ কবিতা ছাপানো হতো না। তিনি খুবই মনোকষ্ট পেতেন। বলতেন- ভালো কবিতাগুলো ছাপানো হয়নি, তিনি যেগুলো গুরুত্ব দিয়ে লিখেননি, এগুলোই ছাপানো হয়েছে। তাই সময় করে অপ্রকাশিত কবিতাগুলি আমাদের পড়ে শোনাতেন। আমরা অনেকটা দায়বদ্ধতায় স্থির হয়ে বসে বসে শোনবার চেষ্টা করতাম, আর মনে অস্থিরতা অনুভব করতাম। এই সিরাজভাই চাকুরিকালীন অপ্রকাশিত কবিতাগুলি দিয়ে কবিতার বই বের করে আমাদের সৌজন্যকপি উপহার দিলেন ও মন্তব্য করার জন্য সময় বেঁধে দিলেন। আমরা এ চমৎকার চরিত্রের অধিকার ব্যক্তিটির নির্দেশ অমান্য করতে পারিনি। যতটা সম্ভব ইতিবাচক মন্তব্য করে তাঁকে উৎসাহিত করেছিলাম। আমরা এক সময় অনুরোধ করলাম যে পত্রিকায় প্রকাশিত কবিতাগুলো দিয়ে একটি বই বের করার জন্য। তিনি উৎসাহবোধ করলেন না। বললেন- একবার প্রকাশিত হয়ে গেছে, বহু পাঠক তা পড়ে ফেলেছে, সুতরাং বই বের করলে কদর থাকবে না। তিনি আমাদেরকে নিরাশ না করে বললেন যে নতুন কবিতা লিখবেন, ঐগুলো দিয়ে বই বের করবেন। বেশ কিছু দিন পর তিনি তাঁর নতুন কবিতার বই এর নামকরণ আমাদের জানালেন এবং একজন শিল্পী ছাত্র দিয়ে প্রচ্ছদও এঁকে নিয়েছেন। তারও কিছুদিন পর জানতে পারলাম-প্রচ্ছদসহ কবিতার বই এর কভার ছাপিয়ে ফেলেছেন, বই এর জন্য কাগজ কিনে প্রেসে জমা রেখেছেন, কিন্তু কবিতা তখনও লিখে জমা দিতে পারেননি এবং জানা মতে তাঁর জীবিত অবস্থায় দ্বিতীয় কবিতার বইটি আর বের হয়নি।
এই সিরাজভাই ৩৪/৩৫ বৎসর বয়সে বিয়ে করেন। তবে ২৫/২৬ বছর থেকেই বিয়ের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কনিষ্ঠ সহকর্মী হিসেবে আমাদের কাছে কখনো কখনো আবেগে মনের কথা বলতেন, কখনো জ্যেষ্ঠতা বজায় রাখতে চেষ্টা করতেন। তবে যে বিষয়টি ছিল উদার আলোচনা ও সিদ্ধান্তের এ ব্যাপারে আমাদের সান্নিধ্য পেতে সর্বদা ছিলেন সচেতন। মাসের প্রথমে বেতন পেলেই আমাদের কাউকে সঙ্গে নিয়ে শাড়ির দোকানে যেতেন। তিনি বলতেন ধরেন আমার স্ত্রী যদি সুন্দরী হন, তবে কোন শাড়িটা মানাবে। আমরা উৎসাহিত হয়ে ২/৩টি নির্বাচিত করে দিতাম। তিনি কখনো একটি বা দুটি কিনে নিতেন, এভাবে শ্যামলা হলে, কালো হলে, লম্বা হলে, বেঁটে হলে - কিরকম শাড়ি মানাবে তখন নবাগত স্ত্রীর জন্য প্রায় দু’শতাধিক শাড়ি তাঁর সংগ্রহে জমা ছিল। বিয়ের পর ভাবী সেগুলো দেখে অবশ্যই খুশি হওয়ার কথা। পান্তরে কেন এত শাড়ি এবং কার জন্য ও সে ব্যক্তিটি কে ইত্যাদি নিয়ে বিয়ের প্রথম বছরটা সিরাজ ভাইকে নাজুক অবস্থায় কাটাতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত আমাদের কৌশলগত সহযোগিতায় বিষয়টি মিটমাট হয়েছিল। তারপর ভাবীর একটা অমূলক যাপিত সন্দেহ নিজেকে পীড়া দিত। আসলে সিরাজভাই ছিলেন অদ্ভুত চরিত্রের চমৎকার মানুষ। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় দুটি বিষয় অত্যন্ত স্পর্শকাতর। একটি হলো- পুরুষ মানুষের আয় রোজগার তথা চাকুরিতে কত বেতন পায় তা জিজ্ঞেস করা। আর দ্বিতীয়টি হলো মেয়েদের বয়স কত তা জানা।
আমার ভাগনীর জন্য বিয়ে প্রস্তাব এলো। ছেলে ততটা লেখাপড়া করেনি। সামর্থবান চাকুরে পিতৃদেব ঔষধের দোকান করে দিয়েছে, দোকানটি নেহাৎ ছোট নয়। খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেছে- দৈনিক ২৫/৩০ হাজার টাকার ঔষধ বিক্রি হয়- কর্মচারী বা অন্যান্য খরচ মিটিয়ে দৈনিক ছেলের হাতে ২/৩ হাজার টাকা থাকে। ভাগনীকেও বেশি লেখাপড়া করানো হয়নি। প্রশ্ন উঠেছে ছেলের বাবা চাকুরে এত টাকা পেলো কীভাবে। পূর্বাপর খবর নিয়ে জানা গেল, ঐ ব্যক্তি চাকুরির আগে তেমন আর্থিক স্বচ্ছল ছিলেন না। ভূমি অফিসে চাকুরির পর জায়গা জমি কিনেছেন, বাড়িতে দালান করেছেন, শহরে বাড়ি করেছেন, ছেলের জন্য দোকান করেছেন এবং অনেক কিছু। তাই ভাগনীকে যেদিন তারা দেখতে এলো, তখন ছেলের পরে একজন ছেলের পিতৃদেবের বিত্ত বৈভবের কথা তৃপ্তি সহকারে বর্ণনা দিয়ে যখন বলতে আরম্ভ করলেন, তখন আমার অপর ভগ্নিপতি বলে উঠলেন- ‘ছেলের বাবা চাকুরিতে কত টাকা বেতন পান ? নিমিষে পরিবেশটা থমথমে হয়ে যায়। কারো মুখে কোনো কথা নেই। আমি ছিলাম সে সভার মুরুব্বি। তাই গলায় কাশ দিয়ে পরিষ্কার করে নিয়ে বললাম- আমরা ছেলের ব্যবসাপতি দেখব, ছেলের বাপের চাকুরির খবর নিতে যাব কেন ? পুরুষ লোক রোজগার নানাভাবেই করে থাকে, এ নিয়ে আলোচনা অবান্তর। ছেলের ঔষধের দোকান, সে ব্যবসাপতি বাড়াতে এজেন্সী আনবে, রোজগার বাড়াবে। সুতরাং এসব কৌশল জানারই বা দরকার কী। ইত্যাকারে বিষয়টি ধামাচাপা দিতে চেষ্টা করলাম। তাও বুঝিয়ে দিলাম- পুরুষ লোকের আয়-রোজগারের ফিকির জানার চেষ্টা বা চাকুরিজীবীর বেতন কত তাও জানা অপমানকর বা বিব্রতকর বিষয়। তবে ভাগনীর বিয়ে এখানেই হয়েছে, কিন্তু চাকুরীজীবী ছেলের পিতৃদেব আমাদের কাছে কোনোদিন সহজ ও সাবলীল হতে পারেনি।
আমার একজন বেয়াইন, তিনি সমাজকর্মী ও নেতৃস্থানীয়। নানা সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। সংসারের কাজে আপত্তি, বাইরের কাজে অতি উৎসাহী। সকালে নাস্তা করে সেজেগুজে বের হন, তারপর কখন যে বাসায় ফিরেন-তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। ভালো বক্তৃতা দিতে পারেন, নিজেকে স্থান-কাল-পাত্র ভেদে যথা যোগ্যতায় উপস্থাপন করতে পারেন, সব ব্যাপারে পারিবারিক প্রসঙ্গটি উচুঁ করে উপস্থাপনা করেন, ছেলেমেয়েদের নিয়ে গর্ববোধ করেন, আত্মীয়তার পরিধিটা বিশাল সামিয়ানা দিয়ে অনুকূলে ছড়িয়ে দেন। যার নামই উচ্চারণ করা যায় সবই তাঁর পরিচিত ও ঘনিষ্ঠজন। একটি মহৎ গুণ হলো কাউকে ছোট করে দেখেন না। সামাজিকতার বন্ধনটা অটুট রাখতে চান এ দুর্মূল্য বাজারেও। বেয়াইন এক ব্যাপারে এতটাই কৃপণ যে বেয়াই নিয়ে কোনো গর্ব বা গৌরববোধ করতে চান না। ব্যক্তিটিকে অনুলেখ্য রাখতে চান। দু’মেয়ে দু’ছেলে লেখাপড়া শেষ করেছে, ভালো চাকুরি করে, বিয়ে দেয়া হয়েছে- সুখী পরিবার বলতে যায় বোঝায়- এরূপ একটি পরিবার। সন্তানরা মায়ের কর্মকান্ডে প্রকাশ্যে গৌরববোধ করলেও আসলে আরো সংযত অবস্থান প্রত্যাশা করে। কিন্তু মুখ ফোটে বলতে পারে না। আমার সঙ্গে বেয়াইনের সম্পর্কটা খুবই চমৎকার।
এ অধিকারে একদিন একটি বেহাশ প্রশ্ন করে বসি। প্রসঙ্গান্তরে আমি তাঁর বয়স কত জিজ্ঞাসা করে ফেলি। তিনি মুখে হাসি রেখেই বললেন- ‘কেন, আমাকে কী বুড়ি বলে মনে হয়? আমি অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম এবং নিজের বোকামির বিষয়টি অনুধাবন করতে পারলাম। বললাম, ‘না বেয়াইন, যদি কিছু মনে না করেন তবে বলতে পারি- এখনও আপনার বিয়ের বয়স শেষ হয়নি।’ তিনি কৃত্রিম হাসিটি দিলেন। কোথায় যেন আঘাত দিয়ে ফেলেছি তা অনুভব করতে পারলাম। কিন্তু উপায় খুঁজে পাচ্ছিলাম না যেন। তারপর থেকে আমাদের দু’জনের মধ্যে একটু দূরত্ব সৃষ্টি হয়। কিন্তু আমি জানতাম- মেয়েদের বয়স কম বললে তারা অতি খুশি হয়, কিন্তু বেয়াইন তা তেমনভাবে গ্রহণ করেননি। আমার অপরাধ- আমি তাঁর বয়স কত- এটা সরাসরি জিজ্ঞাসা করায় মনে মনে খুবই রুষ্ট হয়েছিলেন।
সিরাজভাইকে দেখেছি, কিন্তু তাঁর মনের গভীরে যেতে পারিনি, ভাগনীর শ্বশুরের বিত্তবান হওয়ার চাবিকাঠি ভূমি অফিসের চাকুরি- তা হিসেব মিলাতে পারিনি, বেয়াইনের প্রকৃত বয়সের হদিশ পাওয়ার বোকামিতে নিজেকে অপ্রস্তুত করেছি। কিন্তু কেন? মূলত পরিচিত পরিমন্ডলে আসলেই অদ্ভুত চরিত্রের চমৎকার মানুষগুলো আমাদেরকে মুগ্ধতায় পরিবেষ্টন করে রেখেছে- তারাই, না চাইলেও, আত্মীয়, বন্ধু ও পরিজন।
“ভালোবাসা দুর্মূল্যের হাটে
সস্তায় বিকিকিনি করি
সঙ্গে রাখি আকাশের সমান
এক মসৃণ রুমাল
যার আয়তন বুকের জমিন
সমান বিরাট বিস্ময় যার
গভীরতা অতলস্পর্শী অনন্ত অপার।”




সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৬
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
কার্যালয়: কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশন, তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়,কুমিল্লা-৩৫০০, বাংলাদেশ
ফোন: +৮৮০ ৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২৪৪৩, +৮৮০ ১৭১৮০৮৯৩০২
ই মেইল: hridoycomilla@yahoo.com, newscomillarkagoj@gmail.com,  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশান।
তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : hridoycomilla@yahoo.com Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};