ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন অ্যাপস কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য লাইভ টিভি লাইভ রেডিও সকল পত্রিকা যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
নাসিক নির্বাচন, একজন আইভী ও রাজনীতির রীতি-রেওয়াজ
Published : Monday, 2 January, 2017 at 1:39 AM
নাসিক নির্বাচন, একজন আইভী ও রাজনীতির রীতি-রেওয়াজমোস্তফা কামাল ||
২২ ডিসেম্বর ২০১৬।
শুধু একটি তারিখই নয়, বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন।
নিরপে ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের নজির সৃষ্টির দিন। এত ভালো নির্বাচন এ দেশের মানুষ আগে কখনো দেখেনি। যাঁরাই নির্বাচন পর্যবেণ করতে সরেজমিন নারায়ণগঞ্জ গেছেন, তাঁরা সবাই বলেছেন, সাধারণত ইউরোপীয় দেশগুলোতে এমন নির্বাচনের চিত্র দেখা যায়।
আমরা জানি, এবারই প্রথম দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখন থেকে স্থানীয় নির্বাচন দলীয় প্রতীকেই হবে। নাসিক নির্বাচনে মতাসীন আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। তবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় আওয়ামী লীগের প্রার্থী সেলিনা হায়াত আইভী ও বিএনপির সাখাওয়াত হোসেন খানের মধ্যে।
নির্বাচনের আগে প্রার্থীরা কেউ-ই পরস্পরের বিরুদ্ধে কোনো রকম বিষোদ্গার করেননি। নির্বাচনী প্রচারণা ছিল শান্তিপূর্ণ। যেকোনো ইউরোপীয় দেশের নির্বাচনের সঙ্গে এর তুলনা হতে পারে। আমেরিকার নির্বাচনেও আমরা দেখেছি হিলারি ও ট্রাম্প অত্যন্ত ন্যক্কারজনকভাবে পরস্পরকে গালমন্দ করেছেন। পরস্পরের চরিত্র হনন থেকে শুরু করে জেলে ঢোকানোর হুমকিও দিয়েছেন, যা আমেরিকার নির্বাচনের ইতিহাসে আরেক নজির সৃষ্টি করেছে। এবারের মতো এত নেতিবাচক নির্বাচনী প্রচার-প্রপাগান্ডা আগে কখনো হয়নি।
অথচ বাংলাদেশের মতো একটি পশ্চাৎপদ দেশের সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের পরিবেশ দেখে বিস্মিত হয়েছে উন্নত দেশের মানুষ। তারা ভাবতেই পারেনি, প্রার্থীরা এতটা মার্জিত বক্তব্য দেবেন এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী প্রচার চালাবেন। তাঁদের সহনশীল মানসিকতা জাতীয় রাজনীতিবিদদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, রাজনীতি মানে শত্রুতা নয়, পরমতসহিষ্ণুতা।
যদিও আমাদের জাতীয় রাজনীতি বিরোধপূর্ণ। বড় দুই দলের প্রধানের মুখ দেখাদেখি শুধু বন্ধই নয়, তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্ক শত্রুভাবাপন্ন; সেখানে জেলা পর্যায়ের নেতারা এত বেশি সংযমী হবেন, তা কেউ আশা করেনি। অথচ নারায়ণগঞ্জের প্রাক-নির্বাচন পরিস্থিতি যদি কেউ ল করে থাকেন তাহলে সবাই অকপটে স্বীকার করবেন, এটা বিরল ঘটনা!
একটা সময় বাংলাদেশে নির্বাচনের মানেই ছিল সিল মারা, কেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, মারামারি, হানাহানি। নারায়ণগঞ্জের নির্বাচন দেখে মনে হলো, সেসব এখন ধূসর অতীত। ভবিষ্যতে আমরা আর সেই দৃশ্য দেখতে পাব না। নেতা-নেত্রীরা আর পরস্পরকে গালমন্দ করবেন না। নির্বাচনী প্রচারে তাঁরা তাঁদের নীতি-আদর্শের কথা বলবেন। জনগণকে নানা প্রতিশ্রুতি দেবেন। তাঁদের অতীতের উন্নয়ন কর্মকান্ডের ফিরিস্তিও দিতে পারেন। জনগণ যাঁর কথায় আকৃষ্ট হবে, তাঁকেই ভোট দেবে।
সাধারণত আমরা কী দেখি! যিনি মতায় থাকেন তিনি নানা কারণে অজনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ভোট চাইতে গেলে ভোটাররা তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। তাঁর বিজয়ের সম্ভাবনাও কম থাকে। অথচ আইভী এ েেত্র ব্যতিক্রম ঘটিয়েছেন। তিনি আগেরবার বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তখন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী ছিলেন শামীম ওসমান। তাঁকে বিপুল ভোটে হারিয়ে আইভী মেয়র নির্বাচিত হন।
মেয়র হওয়ার পর আইভী অন্যদের মতো পাল্টে যাননি। সাদামাটা জীবন যাপন করেছেন। অন্যায়, অনিয়ম, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। সার্বণিক প্রটোকলের বেড়াজালে আটকে না থেকে তিনি সাধারণের মতোই নগরবাসীর কাছে ছুটে গেছেন। তাদের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছেন। পাঁচ বছরে অনেক উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন। আবার অনেক উন্নয়নমূলক কাজে হাত দিয়েছেন। তাঁর সার্বণিক চেষ্টাই ছিল নগরবাসীর কল্যাণসাধন। আর সে জন্যই নগরবাসী তাঁকে তাদের আপনজন হিসেবে বিবেচনায় নিয়েছে। সাদা মনের মানুষ একজন আইভী এবং নারায়ণগঞ্জ সিটির উন্নয়নই ছিল তাঁর পুঁজি।  এবার অবশ্য দলীয় সমর্থন পেতে সেলিনা হায়াত আইভীকে তেমন বেগ পেতে হয়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আইভীকে গণভবনে ডেকে নিয়ে তাঁর সমর্থনের কথা জানিয়েছেন। অবশ্য তার আগে প্রধানমন্ত্রী দলীয় চ্যানেল ও গোয়েন্দা সূত্রে জেনেছেন যে আইভীতেই নারায়ণগঞ্জ সিটিবাসীর আস্থা। তারা তাঁকে এত বেশি ভোট দিয়েছে যে (সেলিনা হায়াত আইভী পেয়েছেন এক লাখ ৭৬ হাজার ৮৭৬ এবং সাখাওয়াত হোসেন খান পেয়েছেন ৯৬ হাজার ৬৭৪ ভোট। ৮০ হাজার ভোট বেশি পেয়ে নির্বাচিত।) আইভীকে জাতীয় নেতৃত্বের পর্যায়ে তুলে এনেছেন। তিনি রাজনীতিতে যে প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন, তা জাতীয় রাজনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আমার ধারণা।
বিজয়ী হয়ে পরাজিত প্রার্থীর বাসায় যাওয়ার রেওয়াজ অতীতে রাজনীতিবিদরা মেনে চলতেন। তারপর দীর্ঘ বছর ধরে তা অনুপস্থিত ছিল। মেয়র নির্বাচিত হয়ে সেই রীতি চালু করলেন আইভী। তিনি পরাজিত প্রার্থী সাখাওয়াতের বাসায় মিষ্টি নিয়ে হাজির হলেন। সিটির উন্নয়নে তাঁর সহযোগিতা চাইলেন। তিনিও সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। এটা বর্তমান সময়ের ঘুণে ধরা রাজনীতির জন্য বড় শিা। আশা করি জাতীয় রাজনীতিবিদরা এটা মেনে চলবেন।
নাসিক নির্বাচন অনেক কিছুই আমাদের শিখিয়েছে। ভোটে জেতার জন্য প্রার্থী যে একটা বড় ফ্যাক্টর, সেটাই প্রমাণ করেছেন আইভী। সেই সঙ্গে নাসিক নির্বাচন অনেক প্রশ্নের জবাবও দিয়েছে। দলীয় সরকারের অধীনে যে নিরপে ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্ভব তা প্রমাণিত হয়েছে। তা ছাড়া বর্তমান নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার যে অভিযোগ ছিল, তা খন্ডনের কিছুটা সুযোগ পেয়েছে তারা। এখন ইসি বলতে পারবে, ইচ্ছা করলে এবং সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা পেলে নিরপে ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা সম্ভব।
নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছে। স্বাধীন ও সার্বভৌম নির্বাচন কমিশন গঠন করতে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা প্রয়োজন। সর্বসম্মত প্রস্তাবে ইসি পুনর্গঠন হলে এবং ইসিকে স্বাধীন ও সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান হিসেবে তৈরি করতে পারলে নিশ্চয়ই ভবিষ্যতের কোনো নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না।
আসলে জেনেশুনে কোনো মানুষই নিজেদের কলঙ্কিত করতে চায় না। বর্তমান নির্বাচন কমিশনও তাদের দায়িত্ব পালনের েেত্র নিরপেতা বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। তাতে কোথাও সফল হয়েছে, আবার কোথাও ব্যর্থ হয়েছে। হয়তো সরকারের উচ্চ পর্যায়ের চাপের কারণে অনেক সময় তারা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। যেখানে ব্যর্থ হয়েছে, সেখানেই প্রশাসনের অসহযোগিতা ছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
আমরা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম নির্বাচন কমিশন দেখতে চাই। সেটা সম্ভব হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আর উঠবে না। বৃহত্তর গণতন্ত্রের দেশ ভারত, ব্রিটেন, আমেরিকা কিংবা ইউরোপীয় দেশগুলোর মতো বাংলাদেশে নির্বাচন কমিশনই নিরপে নির্বাচন নিশ্চিত করবে।
আমরা জানি, ১৯৮১ সালে রাজনীতিতে পা রেখেই শেখ হাসিনা ঘোষণা করেছিলেন, তাঁর রাজনীতিই হচ্ছে মানুষের ভাত ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। সেই লড়াই এখনো চলছে। তাঁর সদিচ্ছার কারণেই নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কোনো প নেতিবাচক কর্মকান্ডে জড়াতে পারেনি। তিনি নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী করতে চান বলেই রাজনৈতিক সংলাপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে রাজনীতিতে একটা ইতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টি হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
রাজনৈতিক সংলাপের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদকে সাধুবাদ জানাতে হয়। তিনি সংলাপ শুরুই করেছেন অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল রাষ্ট্রপতির কাছে তাদের প্রস্তাব উত্থাপন করতে পেরে বেশ খুশি। সংলাপের পর রাষ্ট্রপতিও সন্তোষ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন। তার মানে, উভয় পই খুশি।
এরপর জাতীয় পার্টির সঙ্গে আলোচনায় বসেন রাষ্ট্রপতি। অন্য দলগুলোর সঙ্গেও আলোচনা করবেন। সম্ভবত মতাসীন দলের সঙ্গে শেষ দিকে আলোচনা হবে। সংলাপের পর পরই হয়তো ইসি গঠনে একটি সার্চ কমিটি হবে। সার্চ কমিটির প্রস্তাবে যাঁদের নাম আসবে, তাঁদের নিয়ে গঠিত হবে নির্বাচন কমিশন।
আমরা আশা করি, সর্বসম্মত প্রস্তাবেই ইসি গঠন করা হবে। তবে নতুন ইসি গঠন করলেই হবে না। ইসিকে স্বাধীন ও সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে যে ধরনের আইন প্রণয়ন দরকার, তা জাতীয় সংসদে পাস করতে হবে। সে জন্য সরকারের আন্তরিকতা সবচেয়ে বেশি জরুরি। সরকারও নিশ্চয়ই অবগত আছে যে আমাদের দেশের রাজনৈতিক সংকটের মূল কারণ ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনব্যবস্থা।
নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ স্বাধীন নয়। অর্থের জন্য সরকারের কাছে হাত পাততে হয়। যাঁরা নির্বাচন পরিচালনা করেন তাঁরা সরকারের নির্দেশে চলেন। সে কারণেই নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ থাকে।
রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে রাষ্ট্রপতি নিশ্চয়ই সব পরে জন্য যাতে ‘উইন উইন’ হয়, সে চেষ্টা করবেন। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বিএনপির সংলাপের পর যেমন উভয় প খুশি ছিল, ইসি গঠনের পরও সেই খুশি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ুক।
আমরা রাষ্ট্রপতির সফলতা কামনা করি।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক




সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৬
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
কার্যালয়: কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশন, তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়,কুমিল্লা-৩৫০০, বাংলাদেশ
ফোন: +৮৮০ ৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২৪৪৩, +৮৮০ ১৭১৮০৮৯৩০২
ই মেইল: hridoycomilla@yahoo.com, newscomillarkagoj@gmail.com,  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশান।
তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : hridoycomilla@yahoo.com Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};