ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন অ্যাপস কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য লাইভ টিভি লাইভ রেডিও সকল পত্রিকা যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
চার দশকে কুমিল্লা পুলিশ
Published : Thursday, 15 December, 2016 at 3:15 PM, Update: 20.12.2016 7:29:59 PM
চার দশকে কুমিল্লা পুলিশমালিক খসরু।
বিশ্বের সকল সভ্য দেশের দৈনন্দিন অভ্যন্তরীণ সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা, ব্যক্তি, সম্পত্তি নিরাপত্তার মত বহুবিধ জরুরি বিষয় এবং সাধারণ্যে আইন মান্য করার প্রবণতার মানদ-ে সে দেশে বিদ্যমান আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, চাল-চিত্রের রূপ অনায়াসে বুঝে নেয়া যায়। সভ্য দেশে আইনের শাসন সমুন্নত করে সামাজিক ভারসাম্য বজায় রাখার লে আইনানুগ পন্থায় অপরাধ দমন, নিয়ন্ত্রণে রাখা বা আইন ভঙ্গকারীকে অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশি তদন্তের মাধ্যমে বিচারের মুখোমুখি করার ব্যবস্থার পরিপূর্ণ রূপ ক্রিমিনাল ল’ এবং জাস্টিসের প্রতিপাদ্য হিসাবে বিবেচিত হলেও অপরাধীর শাস্তি বিধানই ক্রিমিনাল ল এবং জাস্টিসের মূল বা শেষ কথা নয়। পুনর্বাসন ও পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিও এর আওতাভুক্ত।
মূল কথা হলো, আইনানুগ পন্থায় সমাজে অপরাধ ও অপরাধীদের মোকাবিলা করে অভ্যন্তরীণ সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা নিশ্চিত করে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ অব্যাহত রেখে দেশের ভাবমূর্তি ও সর্ববিধ উন্নয়ন নিশ্চিত করা পুলিশের কাজ। পুলিশ প্রকৃত অপরাধী সনাক্তকরণ এবং তদন্তে প্রাপ্ত অপরাধের মাত্রা নিরপে তদন্তে নিরূপণ করে আদালত সমীপে বিচারের নিমিত্তে সোপর্দ করে থাকে। স্ব্যা-প্রমাণের ভিত্তিতে বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অপরাধীর শাস্তি, সংশোধন ও পুনর্বাসনের মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলী পালনের মাধ্যমে ক্রিমিনাল জাস্টিস ব্যবস্থা সমুন্নত হয়ে থাকে। ক্রিমিনাল জাস্টিস ব্যবস্থা বলতে বুঝায়, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করে অধিকহারে অপরাধীদের বিচারে সোপর্দ করে জনগণের মাঝে নিরাপত্তার আস্থা তৈরি করে বুঝিয়ে দেয়া, গৃহীত ব্যবস্থা শুধু নিরপেই নয় আইনমান্যকারীদের জন্য রাকবচ। এভাবে রচিত হয়ে থাকে সভ্য সমাজ-ব্যবস্থার শক্ত ভীত।
পুলিশের আদি ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ইংলন্ডের রাজা ১ম এডওয়ার্ড লন্ডনে শান্তিরার্থে ‘ওয়াচ এন্ড ওয়ার্ড’ বিভাগ চালু করেন। উল্লেখ্য, ইংল্যা-ের অনেক আগে সম্রাট অশোকের আমলে উপমহাদেশে পুলিশের অস্তিত্ব বিদ্যমান ছিল। শেরশাহের শাসনামলে পরগণার আইন শৃঙ্খলার দায়িত্ব দেয়া হয় ‘শিকদারের’ উপর। পরবর্তীকালে কোতয়ালের উপর। আইন-ই-আকবরীতে শহর পুলিশের দায়িত্ব কোতোয়ালের উপর থাকার প্রমাণ মেলে।
চোখ ফেরান যাক কুমিল্লা পুলিশের দিকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে কুমিল্লা পুলিশের রয়েছে অগ্রণী ভূমিকা। উল্লেখ্য, মুজিবনগর সরকারে পুলিশের ডাইরেক্টর জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেন কুমিল্লার কৃতী সন্তান আবদুল খালেক। তিনি ছিলেন প্রথম স্বরাষ্ট্র সচিব। বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় হতে প্রকাশিত, হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, দলিলপত্রঃ তৃতীয় খ-ের মুজিবনগরঃ প্রশাসন’ অংশে মোট ২২ জন পুলিশ সুপারের তালিকার ক্রমিক নং-৫ (পৃষ্ঠা-২৯৯) হতে দেখা যায়, ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ অর্থাৎ স্বাধীনতা অর্জন লগ্নে কুমিল্লার প্রথম পুলিশ সুপারের নিয়োগ লাভ করেন, জনাব চিত্ত বিনোদ দাস (সিবি দাস)। স্মারক নং জিএ/৩১৬৫ (৬) স্বারিত হয় ১৩-১২-১৯৭১। আমি এই স্মারক সূত্রটির ফটো কপি লাভ করি বোদ্ধা পাঠক, কুমিল্লা পুলিশ অফিসের প্রাক্তন রিডার ঠাকুর জিয়াউদ্দিন আহমদের কাছ থেকে। এজন্য জানাই কৃতজ্ঞতা। সিবি দাস বাবু পুলিশ হেড কোয়ার্টার হতে এআইজি (ক্রাইম) হিসাবে অবসরে যান। এআইজি (কনফিডেন্সিয়াল) এবং আইজিপি মহোদয়ের প্রথম স্টাফ অফিসার হিসাবে কাজ করার সময় আমার বিরল সুযোগ হয়েছিল এই স্বনামধন্য সদা হাস্যময় পুলিশ অফিসারের সাথে কাজ করার। কোন জটিল বিষয়ে জানতে হলে বা ব্যাখ্যার জন্য তাঁর কাছে ছুটে যেতাম। তিনি ছিলেন আইন-বিশারদ। সকল সিনিয়র অফিসার তাঁর কাছ থেকে পেয়েছেন আইনের খুঁটিনাটি ব্যাখ্যা। পাঠক জেনে আশ্চর্য হবেন মুক্তিসংগ্রামী এই অফিসারের নাম স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরেও আমরা কুমিল্লার পুলিশ সুপারের ‘অনার বোর্ডে’ সন্নিবেসিত করতে পারিনি। এ লজ্জা আমাদের সকলের। পুলিশ অফিসে পুলিশ সুপারের অফিসে স্থাপিত ‘অনার বোর্ডে’ বর্তমান পুলিশ সুপার পর্যন্ত মোট ৪৫ জন পুলিশ সুপারের নামের তালিকার প্রথম নামটি মোহম্মদ ইদ্রিসের। তাঁর কর্মকালঃ ১৫-১০-১৯৪৭ হতে ০২-০৩-১৯৫০ পর্যন্ত। ১৪ নং ক্রমিকে নাম রয়েছে মহান মুক্তিসংগ্রামী শহীদ পুলিশ সুপার মুন্সী কবিরউদ্দিনের নাম। নামের পাশে লিখা হয়েছে- (পাক সেনাবাহিনীর হাতে শহীদ হন) কথাটি। তাঁর কর্মকাল ১৮-০৮-১৯৭০ হতে ২৬-০৩-৭১। আমি শহীদ পুলিশ সুপার বীর মুক্তিসংগ্রামী মুন্সী কবিরউদ্দিন্সহ মোট ৩১ জন শহীদ পুলিশ অফিসারের নাম পুলিশ লাইনের শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে উৎকীর্ণ করি। কুমিল্লার পুলিশ সদস্যবৃন্দ পুলিশ সুপারের নেতৃত্ত্বে ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বর এই শহীদ বেদীতে শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদন করে জাতীয় বীরদের স্মরণ করে থাকেন। বীর মুক্তিসংগ্রামী পুলিশ সুপার শহীদ কবিরউদ্দিনের পর দখলদার পাকিস্তান সরকার কুমিল্লার পুলিশ সুপার হিসাবে নিয়োগ দেয় এএসএম শাহজাহানকে। তিনি ০৬-০৫-১৯৭১ সালে কুমিল্লার পুলিশ সুপার পদে যোগদান করে ০৩-০১-১৯৭২ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। প্রতীয়মান হয় সিবি দাস বাবু আদেশ পেয়েও ০৩-০১-৭২ পর্যন্ত পদে যোগদান করেন নি বা করতে পারেননি! এর পর পুলিশ সুপার হয়ে মোহম্মদ ইসমাইল হোসেন ২১-০৯-১৯৭২ তারিখে যোগদান করেন। অর্থাৎ মধ্যবর্তী ৪৮ দিন কার নেতৃত্বে জেলা পরিচালিত হয়েছিল এবং সি বি দাস বাবু কবে যোগদান করেন অথবা আদৌ যোগদান না করে অন্যত্র বদলি হয়েছিলেন কি না তা গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি শিানবিশ ডিএসপি হিসাবে ১৯৭৪ সালে পুলিশ সুপার ইসমাইল হোসেনের অধীনে কুমিল্লায় যোগদান করি। সম্প্রতি তিনি প্রয়াত হয়েছেন। সে সময় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ছিলেন এ বি সামসুদ্দীন এবং ডিএসপি হেডকোয়ার্টার ছিলেন টি কে চাকমা। উল্লেখ্য, তিনি চাকমা রাজা দেবাশিষ রায়ের শ্বশুর। এই সময় কালের মধ্যে ১৫ আগষ্ট ১৯৭৫ ঘটে বাংলাদেশের ইতিহাসের করুণতম ঘটনা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকা-। হত্যাকা-ের অন্যতম নায়ক ছিলেন এই জেলার দাউদকান্দি থানার দশপাড়া গ্রামের উচ্চাভিলাষী বিশ্বাসঘাতক খন্দকার মুশতাক আহমদ। তিনি প্রায় প্রত্যেক মাসেই কুমিল্লায় এসে কোটবাড়িতে অবস্থিত ‘বার্ডের’ অনুষ্ঠিত বিভিন্ন সভায় যোগ দিতেন। তাছাড়া দশপাড়ায় একটি ‘রেষ্ট হাউস’ নির্মাণ করে সেখানেও বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গের সাথে মিলিত হতেন। অনেকের ধারনা, তিনি এখানে এসে অনুসারীদের নিয়ে গোপন ষড়যন্ত্র পাকাতেন। তার অত্যন্ত কাছের মানুষ ছিলেন বার্ডের ডিরেক্টর মাহাবুবুল আলম চাষী।  মনে পড়ে বরুড়া থানার পয়ালগাছা গ্রামে কর্নেল গিয়াসুদ্দিনের বাড়ির বহির্ভাগ হতে গোপন সূত্রের ভিত্তিতে বরুড়া থানা পুলিশ ৫১ টি পরিত্যক্ত রাইফেল ও বিপুল সংখ্যক গুলি মাটির নিচ হতে উদ্ধার করে। মামলা হয় অস্ত্র আইনে। আমি ছিলাম এর প্রথম তদন্তকারী অফিসার। আমার তদন্তে কোন অপরাধীর নাম সনাক্ত হয়নি। আমার বদলিজনিত কারণে অন্য একজন পুলিশ অফিসারের উপর তদন্তভার ন্যস্ত হয়। পরবর্তী সময়ে পুলিশের তদন্তকারী অফিসারের উপর মার্শাল ল কোর্টের চেয়ারম্যান পাকিস্তান ফেরৎ মেজর (নাম মনে নেই) চাপ সৃষ্টি করে  মুক্তিসংগ্রামী কর্নেল (পরে ব্রিগেডিয়ার) গিয়াস বীর বিক্রমের পরিবারকে হেনস্তা করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিলেন বলে শোনা যায়! আমি বদলি সূত্রে ঢাকায় পুলিশ সুপার মাহাবুব-উদ্দীন আহমদ, বীর বিক্রম যিনি ঢাকার পুলিশ সুপার হিসাবে ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ মুজিবনগর সরকার কর্তৃক নিয়োগ পান তাঁর অধীনে যোগদান করি। উল্লেখ্য, মুজিবনগর সরকার যে ২২ জন পুলিশ সুপারকে বিভিন্ন জেলার দায়িত্বে নিয়োগ দেন সেই তালিকায় তাঁর নাম ৯নং ক্রমিকে স্থান পায়।    পরবর্তী সময়ে আমি কুমিল্লার পুলিশ সুপার পদে ২৩-০৭-১৯৮৬ যোগদান করে ২৪-০২-৮৯ পর্যন্ত কর্মরত ছিলাম। সকল সরকারের আমলে কুমিল্লার রাজনীতিবিদগণ জাতীয় রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তারের কারণে অনেকে মন্ত্রী পদে বরিত হয়েছেন। এই ধারা এখনও অব্যাহত আছে। আমি প্রয়াত কাজী জাফর আহমদ, ইঞ্জিনিয়ার আবদুর রশিদ, গোলাম মোস্তফা, ফখরুল ইসলাম মুন্সীকে মন্ত্রী হিসাবে পাই। বৃহত্তর কুমিল্লার কথা বলতে গেলে প্রধানমন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরী, মেজর জেনারেল সামসুল হক এবং প্রতিমন্ত্রী মওলানা মান্নানের নাম উঠে আসে। এছাড়া বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আসতেন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও অন্যান্য মন্ত্রীরা। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মাঝে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ জেলা হিসাবে ভিআইপিদের নিয়মিত আসা যাওয়ায় কুমিল্লা পুলিশকে প্রায়শঃ নিরাপত্তা ডিউটিতে অধিক ব্যস্ত থাকতে হতো। সে সময় পুলিশের সংখ্যা অপ্রতূল থাকায় রিজার্ভ ফোর্সের বাইরে থানার ওসি এবং অন্যান্য অফিসারদের পুলিশের রুটিন কাজ বাদ দিয়ে ভিআইপি ডিউটিতেই মোতায়েন করা ছাড়া উপায় ছিলনা। যখন পুলিশ সুপার পদে যোগদান করি সে সময়ে দাউদকান্দি ও চান্দিনা থানার মাঝামাঝি ফাঁকা জায়গায় বাস ডাকাতি হতো। ডাকাতি বন্ধে একটি স্কুলে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করে হাঁটা টহল জোরদার করি। এতে অবস্থার কিছুটা উন্নতি ঘটলেও ডাকাতি বন্ধ করা যায়নি। তখন ভিন্ন পথ ধরে অপরাধপ্রবণ এলাকার পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলিতে দিনে ও রাতে নিয়মিতভাবে সন্দেহভাজন, ওয়ারেন্ট ও মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালিয়ে ডাকাতি বন্ধে শুভ ফল জোটে। একইভাবে চৌদ্দগ্রাম, কুমিল্লা-লাকসাম, বুড়িচং-মুরাদনগর সড়কে অপরাধ দমনে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ প্রভূত সাফল্য অর্জন করে। ফলে সমগ্র কুমিল্লা জেলার আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির সম্যক উন্নতি ঘটেছিল। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল জনগণের প্রভূত সহযোগিতা লাভের। জন সহযোগিতার সাফল্য পেয়েছিলাম। জন সহযোগিতার একটি উদাহরণ এখন উল্লেখ করতে চাই। লাকসামের উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন ভাইয়া গ্রুপের মকসুদ আলী। তিনি তার সীমানা দিয়ে প্রবাহিত ডাকাতিয়া নদীতে লোহার ফেন্সিং দিয়ে মাছের চাষ প্রকল্প হাতে নেন। এদিকে কুমিল্লা, চৌদ্দগ্রামের চেয়ারম্যানবৃন্দ জনগণকে বুঝাতে সম হন এই ফেন্সিংয়ের কারণে বর্ষার পানি যথা সময়ে না নামার ফলে জলাবদ্ধতা দেহা দিয়েছে। জনগণ এই কথায় বিশ্বাস স্থাপন করে। তারপর একদিন উভয় থানার হাজার হাজার প্রতিবাদী মানুষের সমাবেশ ঘটিয়ে বিজয়নগরের পাশ দিয়ে প্রলম্বিত ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ ও চাঁদপুর-কুমিল্লা সড়ক রেলক্রসিং পয়েন্ট বন্ধ করে দেয়া হয়। প্রবল উত্তেজনা সমগ্র এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য অঞ্চলে তা সংক্রামিত হয়! ঢাকায় এরশাদ সরকার প্রমাদ গোনে। কিভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যায় তা নিয়ে চলে উচ্চ পর্যায়ে সভা। এক পর্যায়ে রেল চলাচল নির্বিঘœ করতে প্রয়োজনে ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টের সেনা সদস্যদের সাহায্য প্রাপ্তির কথা জানান হয়। পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখতে আসেন ব্রিগেডিয়ার ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান এনডিসি, পিএসসি, সি (পরবর্তীকালে মেজর জেনারেল ও সেনা প্রধান)। আমরা স্পিড বোটে করে বাঁধ দেয়া ডাকাতিয়া নদীর এক প্রান্ত হতে অপর প্রান্তে মোহনা পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে পানির গতিরোধের সম্ভাবনা যাচাই করে তেমন কোন প্রতিবন্ধকতা পাইনি! তাহলে কি হবে? কথা চাউর হয়েছে ‘পানি আটকে আছে’।  তাই ফেন্সিং উঠিয়ে ফেলতেই হবে। আর কোন কথাই গ্রহণীয় নয়। এদিকে কাজী জাফর আহমদ (তখন এমপি) ও ডিসি আবদুস ছালাম ভাইকে আমি আমার জীপ চালিয়ে প্রথমে লাকসামে নিয়ে যাই। সেখানে এমপি মহোদয়ের বাড়িতে দীর্ঘ সময় ধরে চলে আলোচনা। এক পর্যায়ে আমি আমার জীপে করে কাজী জাফর আহমদকে সরেজমিনে পরিস্থিতি দেখাতে লাকসাম থেকে ৩/৪ কিলোমিটার দূরে নদীর একটি বাঁক দেখাতে নিয়ে যাই। সেখানে কিছু সংখ্যক উত্তেজিত লোক প্রতিবাদ করে জানায় কিছুতেই এই ফেন্সিং সরান চলবে না। আমার সাথে ওসির নেতৃত্বে ছিল মাত্র ৫ জন ফোর্স। পরিস্থিতি উত্তেজনাকর হলেও কোন বিপত্তি ঘটেনি। আমরা চলে আসি লাকসামে। ওয়ারলেসে বিজয়পুর হতে পরিস্থিতির অবনতির কথা জানতে পারি। মানুষ মারমুখো হয়ে উঠে। এরপর বহু কষ্টে লোক জোগাড় করে পানির নিচে স্থাপিত তিনটি ফেন্সিং কেটে তুলতে আমরা সম হই। সেগুলি নিয়ে কুমিল্লার পথে রওনা হয়ে বিজয়নগরের কাছে পৌঁছতে শুরু হয় পাথর বৃষ্টি! অবস্থা বেগতিক বুঝে কাজী জাফর আহমদ আমাকে গাড়ি ঘুরিয়ে চাঁদপুরের দিকে চলে যেতে বলেন। আমি বলি ‘আপনারা গাড়িতে বসেন আমি একাই লেবেল ক্রসিং পয়েন্টে যাচ্ছি’। যদিও প্রবল উত্তেজক পরিবেশে এগিয়ে যাওয়া কঠিন ছিল তবুও মনোবল নিয়ে একাই এগিয়ে যাই। সাথে ছিল বডিগার্ড। হট্টগোল কেন্দ্রে পৌঁছে হ্যান্ডমাইকে সকলকে আশ্বস্ত করে বলি ফেন্সিং ভেঙ্গে তিনটি আমরা নিয়ে এসেছি। এতে সকলে সমস্বরে চিৎকার করে বলেন, ‘তিন গো বারা মাত্র’। সবগুলি ভাংতে হবে। বলি বাকিগুলি অবশ্যই সরান হবে তবে সময় লাগবে।‘ কেউ কেউ এ কথায় সায় দিলেও বেশিরভাগ মানুষ অনড় অবস্থানে নিয়ে গোঁ ধরে বসে স্লোগানে দশদিক মুখরিত করে তোলে। এক পর্যায়ে আমি গাড়ির কাছে ফিরে এসে কাজী জাফর সাহেবকে রাজনৈতিক নেতা ও প্রাক্তন মন্ত্রী হিসাবে রেল ক্রসিংয়ের কাছে গিয়ে কথা বলে জনগণকে আশ্বস্ত করতে অনুরোধ জানাই। তিনি বলেন ওরা তাঁকে আক্রমণ করবে। তার চেয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে চাঁদপুরে যেতে চান। অনেক অনুরোধের পর তিনি সম্মত হন। আল্লাহপাকের অসীম রহমতে উত্তেজনা ধীরে ধীরে প্রশমিত হয়। তিনি বক্তব্য দেন এবং বলেন নদীতে একটি ফেন্সিংও থাকবে না। ‘তবে সবগুলি ভাংতে দুই একদিন সময় লাগবে। যা  হোক রাত প্রায় ১১ টার পরে আগত জনগণ অবরোধ তুলে ফিরে যেতে শুরু করে। আমরা রাত সাড়ে বারটার এমপি আনসার আহমদ ও উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল আউয়ালকে নিয়ে সার্কিট হাউসে পৌছি। কাজী জাফর সাহেব প্রথমে প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে ফোন করে সামগ্রিক পরিস্থিতি অবহিত করেন। প্রেসিডেন্ট মহোদয় শান্তিপূর্ণ সমাধানে সন্তোষ প্রকাশ করেন। এরপর তিনি কথা বলেন আইজিপি আবদুর রকীব খন্দকার এবং এসবি’র ডিআইজি বিশ্ববিদ্যালয়ে সহপাঠি আজিজুল হকের সাথে। তিনি আমার সাহসিকতার ভূয়সী প্রশংসা করেন। বলতে দ্বিধা নেই, পুলিশের ভাগ্যে প্রশংসা ও নিন্দা যেন হাত ধরাধরি করে চলে। জনাব কাজী জাফর কুমিল্লা পৌরসভার নির্বাচনে জাতীয় পার্টির ইয়ার আহমদ সেলিমের জয় সুনিশ্চিত করার পে ছিলেন। আমি নিরপেতা রা করে কোনরূপ অসঙ্গতি হতে দিইনি। পুলিশ দল নিয়ে আমি ডিসি ছালাম ভাইকে আমার জীপে বসিয়ে বিভিন্ন নির্বাচন কেন্দ্রে যাই। যেখানে ব্যত্যয় দেখতে পাই সেখানে নির্বাচন বন্ধ করে দেয়া হয়। ১০টি কেন্দ্রের নির্বাচন ডিসি মহোদয় বন্ধ করেন। পরিণতিতে কাজী জাফর আহমদের বিরাগভাজন হয়ে আমাকে অসময়ে বদলি করে দেয়া হয়। বদলির চাকরি তাই বদলি হওয়া! চট্টগ্রামে পৌঁছে জানতে পারি আমার ডিসি পোর্ট হিসাবে যোগদান আদেশ বাতিল করা হয়েছে। পরিবার-সন্তানদের নিয়ে কোথায় গিয়ে উঠব তা ছিল একেবারে অনিশ্চিত! পাঠক ভেবে নিন কি অসহনীয় অবস্থা আমাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে। আল্লাহপাকই সহায়। আমার দূরসম্পর্কীয় আত্মীয় সাংবাদিক জহুর হোসেন চৌধুরীর সেজ ভাই ইকবাল হোসেন চৌধুরী ও তাঁর শ্বশুর (মামা) আলকরার আমিনুল ইসলাম চৌধুরী (দুলাভাই), বেগম শাহানা ইকবাল আমাকে তাঁদের চট্টেশ্বরীর বাড়িতে ঠাঁই দেন। এখানে দীর্ঘ সাত মাস অবস্থান করি। আজও সেই ঘটনা  কুমিল্লায় আমার পুলিশ জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হয়ে স্মৃতিতে ভাস্বর হয়ে আছে। তারপরও আমি বলব, আমি ধন্য হয়েছি কুমিল্লাবাসীর গভীর ভালবাসায় সিক্ত হয়ে। যে ভালোবাসা প্রায় ত্রিশ বছর পরেও আমাকে কুমিল্লায় পাগলপারা করে টেনে নিয়ে যায়। আমি কুমিল্লাবাসীর উষ্ণ সান্নিধ্যে অবগাহন করে প্রীত হই। এই প্রাপ্তি আমার সকল অপ্রাপ্তিকে মুছে দিয়ে অকৃত্রিম ভালবাসা দিয়ে দেহ-মন ভরিয়ে দেয়। ঐশী আনন্দে অন্তরে জাগে অফুরন্ত প্রাণশক্তি! আমার খ-িত জীবনের বিগত চার দশকের খ- চিত্রের কোলাজের পরিসমাপ্তি টেনে বলি, আমার জন্য এ এক অভাবনীয় প্রাপ্তি। জয়তু কুমিল্লা। জয় হোক কুমিল্লা পুলিশের।
লেখকঃ মালিক খসরু, পিপিএম। প্রাক্তন পুলিশ সুপার, কুমিল্লা। রম্য লেখক, গবেষক ও প্রাবন্ধিক। ঢাকা-২৯ নভেম্বর ২০১৬।




সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৬
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
কার্যালয়: কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশন, তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়,কুমিল্লা-৩৫০০, বাংলাদেশ
ফোন: +৮৮০ ৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২৪৪৩, +৮৮০ ১৭১৮০৮৯৩০২
ই মেইল: hridoycomilla@yahoo.com, newscomillarkagoj@gmail.com,  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশান।
তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : hridoycomilla@yahoo.com Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};