ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন অ্যাপস কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য লাইভ টিভি লাইভ রেডিও সকল পত্রিকা যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
এ কোন কুমিল্লা আমার
Published : Thursday, 15 December, 2016 at 3:13 PM, Update: 20.12.2016 7:29:16 PM
এ কোন কুমিল্লা আমারমোস্তফা হোসেইন।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করি। বিভিন্ন জেলায় যাই। সেই সুবাদে মানুষের সহযোগিতা,নির্লিপ্ততার পাশাপাশি অসহযোগিতার স্বাদও পাই। যখন সহযোগিতা পাই, ভালো লাগে। নির্লিপ্ততায় কাক্সিক্ষত ফল পাই না। কিন্তু যখন অসহযোগিতা দেখি, ভাবি হয়তো আমাকে উপস্থাপনে ঘাটতি আছে নতুবা মানুষ চিনতেই ভুল করেছি। কিন্তু যখন নিজের জেলায় গিয়ে অনেক জায়গায়ই চোখ ফেরানো মানুষের সাক্ষাৎ মেলে ভাবি, এই কি আমার কুমিল্লা? খুব ভালো অভিজ্ঞতা নেই আমার ঝুলিতে। প্রথমই বলে নেই এটা আমারও অযোগ্যতা হতে পারে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে- মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সংগ্রহে কুমিল্লায় আমি বেশিরভাগই অসহযোগিতা পেয়েছি। অথচ তাদের কাছ থেকে তথ্য সহযোগিতা সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশিত ছিল।
কুমিল্লার একজন বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনৈতিক নেতার কাছ থেকে সময় চাইলাম। তিনি বললেন, মাগরিবের সময় আসেন আমার অফিসে। মাগরিবের পরপর তার অফিস কাম আড্ডাখানায় গিয়ে দেখি অন্তত ২৫ জন মানুষ বসে আছে। সালামের জবাব দিলেন মাথা নেড়ে। দাঁড়িয়ে থাকলে নেতার অসম্মান হবে তাই নিজেই একটা চেয়ার দখল করে বসলাম। নিজের পরিচয়টা দিতে হলো প্রয়োজনেই। তারপর শুনতে থাকলাম গালি। অশ্রাব্য গালি বর্ষণ করে চলেছেন শিষ্য-ভক্তদের। যে ঢুকে তাকেই সালামের জবাব দেন একটা অশ্লীল গালিতে। সময় যায়- ঘন্টাখানেক হয়ে গেলে স্মরণ করিয়ে দেই। তিনি একজনকে বলেন সবাইকে চা দিতে।
এশার নামাজেরও আজান হই হই করে। আবারো স্মরণ করিয়ে দিলাম। শুনলেন বলেও মনে হলো না। কয়েক দফা গালি কয়েকজনকে দিলেন। তারপর আবার মনে করিয়ে দিলাম, ভাই আমি ঢাকায় ফিরব। এবার তিনি জবাব দিলেন, আমার ইন্টারভিউ করতে হলে একসপ্তাহ আগে এপয়েন্টমেন্ট করে আসবেন। সুতরাং শেষ বাসে ঢাকা ফিরতে হলো। ফেরার পথে ভাবলাম- মুক্তিযুদ্ধের তথ্য নাইবা পেলাম, অভিজ্ঞতাটাও কম কিসের?
একবার আরেকজনকে ফোন করলাম, ভাই আগামীকাল কুমিল্লা আসছি, আপনি কি আমাকে একটু সময় দেবেন। কুমিল্লার মুক্তিযুদ্ধ প্রস্তুতি নিয়ে কথা বলব। তিনি বললেন, লাঞ্চটাইমে তিনি আদালতে থাকবেন। সেখানে কথা হতে পারে। সেই অনুযায়ী পরদিন কুমিল্লা গেলাম। আদালতে গিয়ে পেলাম না তাঁকে। ফোন দিলাম। বললেন, তিনি এখন উপজেলা পরিষদে আছেন, সাড়ে ৪টায় জেলা পরিষদে থাকবেন, সেখানে যেন যাই। বিকেলে জেলা পরিষদে পাওয়া গেল না। ফোন করলে জবাব পেলাম, সন্ধ্যার পর তাঁর বাসায় গেলে তিনি কথা বলতে পারবেন। সন্ধ্যায় কি পাবো ফ্রি? অন্যদিকে একটা রাত বাসার বাইরে থাকার মানে কিছু পয়সার শ্রাদ্ধ। তাই সন্ধ্যার বাসে আমাকে ঢাকাতে ফিরতে হলো। বাসে ওঠে নেতাকে দুঃখ প্রকাশ করলাম আমার ব্যর্থতার জন্য।
পকেটের পয়সায় গ্রামে গ্রামে ঘুরে যখন মুক্তিযুদ্ধের ক্ষতগুলো দেখি অনেক সময় নিজেকেও অপরাধী মনে হয়। ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার এক যোদ্ধাহত (একটি পা হারিয়েছেন একাত্তরে) ব্যক্তিকে নিয়ে একাধিকবার লিখেছি পত্রিকায়। নিজের পক্ষে আর্থিক সহযোগিতা করার সামর্থ না থাকায় প্রায়ই মনে হয়, এই লেখা পড়ে কেউ যদি এগিয়ে আসেন। তো সেই যুদ্ধাহত ব্যক্তির ওপর লেখা পড়ে প্রবাসী তিনজন সাড়া দিলেন। বললেন, তারা ওই ব্যক্তিকে একটা ঘর ও মাসিক হারে কিছু অর্থ সাহায্য করতে চান। ওই ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করতে তার নাম ঠিকানা দিয়ে দিলাম। জার্মানীতে থেকেই তিনি তার এক নিকটজনকে পাঠালেন ওই গ্রামে। ওই গ্রাম থেকে খবর পাওয়া গেলো, পঙ্গু লোকটির পা একাত্তরে হারাননি। এবং ঘটনাও পুরোপুরি ঠিক নয়। প্রবাসী ভদ্রলোক বললেন, আপনার তথ্য মনে হয় যথাযথ নয়। হিসাব করে দেখলাম, প্রতিশ্রুত সহযোগিতা বাবদ ৫ লাখ টাকা থেকে বঞ্চিত হলেন বিনা চিকিৎসায় এক সন্তান ও স্ত্রী হারানো ভদ্রলোক। শুধুই বিভেদপূর্ণ ওই গ্রামের কয়েকজনের কারণে। আর সাংবাদিক ও মুক্তিযুদ্ধের গবেষক হিসেবে আমার পরিবেশিত তথ্যও সন্দিগ্ধ হলো।
না, কুমিল্লা শুধু অসহযোগিতার জায়গাই নয়। লাকসাম বেলতলী বধ্যভূমি নিয়ে জাতীয় সংবাদ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রথম প্রচার হয় আমার মাধ্যমে। কুমিল্লা থেকে আমাকে লাকসাম নিয়ে গিয়েছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা ( ১৯৯৫ সালের ঘটনা। মুক্তিযোদ্ধার নাম স্মরণ করতে পারছিনা)। সেখানে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা জাহাঙ্গীর মাওলা সাহেবের সহযোগিতা পেলাম। তিনি বধ্যভূমিতে গোরখোদককেসহ কঙ্কাল ওঠানোর জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন তখন রাত ১২টা। রাত ১টা পর্যন্ত আমাকে সময় দিয়েছিলেন শুধুই মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ভালোবাসার কারণে।
সহযোগিতা পেয়েছিলাম অধ্যক্ষ আব্দুর রউফ ও  মোমিনুল হক দানামিয়ার কাছ থেকে। কুমিল্লার গৌরব তিন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা যথাক্রমে মোজাম্মেল হক আবু, আবু জাহিদ আবু ও সাইফুল ইসলাম সাফুর কবর ও মৃত্যুস্থল দেখতে যাবো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জমশেদপুরে। মোজাম্মেল হক আবুর পরিবার মাধ্যমে কবরগুলো পাকা ও সংরক্ষণ করছিলেন। এই শহীদের ভাই বুলবুলও ছিলেন সঙ্গে। তাদের সঙ্গী হয়ে গিয়েছিলাম জমশেদপুর। এমন সহযোগিতা আরো পেয়েছি। বিশেষ করে অধ্যক্ষ সৈয়দ আব্দুল কাইউম ও অধ্যক্ষ নজরুল ইসলামের কথা বলতেই হয়। তারা আমাকে সঙ্গে নিয়ে অনেক জায়গায় গিয়েছেন। যে কারণে আমার পক্ষে দ্রুত কাজ করা সম্ভব হয়েছে।
কুমিল্লার ৫/৬টি উপজেলায় সম্প্রতি যোগাযোগ করেছি অনেকের সঙ্গে। সংশ্লিষ্ট কিছু মুক্তিযোদ্ধার ফোন নম্বর সংগ্রহই মূল উদ্দেশ্য ছিল। জবাব পাওয়া গেছে, খোঁজ নিতে হলে আমাকে যেতে হবে। একজনকে বললাম, ভাই আমি যেতে চাই তার আগে সংশ্লিষ্ট লোকের সঙ্গে কথা বলে এপয়েন্টমেন্ট করা দরকার। তিনি বলে দিলেন, তাঁর পক্ষে সময় দেওয়া সম্ভব নয় ফোন নম্বর দেওয়ার মতো।
সবচেয়ে বড় সমস্যাটা দেখা যায়, যখন কোনো তথ্য সংগ্রহে যাওয়া হয় যিনি হয়তো ঘটনাস্থলেই ছিলেন না তিনিই অকপটে বলে দেন ঘটনা এভাবে ঘটেছে। অথবা এমন কথা বলেন, ওই ঘটনা তিনিই সবচেয়ে বেশি জানেন। অন্যরা জানবে কোথা থেকে।
নিজের জেলার এই ঘটনাগুলোতে মর্মাহত হই যখন দেখি অন্য জেলায় কাজ করতে গিয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাই। সিলেটের তেলিয়াহাটি চা বাগানের শ্রমিক প্রফুল্ল পাত্রের একটা উদাহরণ দিতেই চাই। সারাদিন গাইড হিসেবে কাজ করলেন ভদ্রলোক। পরদিনও করলেন। দুপুরে ফিরলাম সিলেট শহরে। ভাবলাম, দুইদিন তাঁর রোজগার বন্ধ। দিন আনে দিন খায়। কিছু টাকা দেই। রাস্তায় দাঁড়িয়ে যখন তাঁর হাতে কিছু টাকা তোলে দিতে যাবো। দেখি তাঁর চোখে জল। বললেন, ভাগ্যগুণে বেঁচে গেছি একাত্তরে। আমার সহযোদ্ধারা কয়েকজন স্বাধীনতাই দেখেননি। আমি স্বাধীন বাংলাদেশের আলোবাতাসে ৪০ বছর টিকে আছি। একাত্তরের দুর্বিসহ সেই ঘটনা প্রকাশে আপনি কাজ করছেন, আপনাকেতো সামান্য সময় দিয়েছি মাত্র। আপনার কাছ থেকে আমি টাকা নেব?
শ্রদ্ধা জানাতে হয় মৌলভীবাজারের আমির হোসেন মাস্টার ও সজলকুমার চক্রবর্তীকে। বললাম, ভাই একনাগারে সপ্তাহকাল ঘুরে কান্তি বোধ করছি। দয়া করে যদি একটু হোটেলে আসতেন। পরদিন দু’জনেরই কাজ। বললেন রাতে আসতে চান। তবে শহর থেকে দূরে তাদের বসতি। তাই আসতে দেরি হয়ে যাবে। দেরিই হলো, রাত সাড়ে ১২টায় এলেন তারা। দু’জনই দুই মোটরবাইক ভাড়া করে এসেছেন আলাদা স্থানে বাড়ি হওয়ায়। ঘন্টাকাল ইন্টারভিউ দিয়ে তারপর রওনা হলেন ১০ কিলোমিটার দূরে রাজনগরে। এমন ঘটনা অনেক আছে সারা দেশে।
কিন্তু আমার নিজের জেলায় তাদের মতো মানুষের সংখ্যা খুবই কম। এই অভিজ্ঞতার প্রকাশ যদি খারাপ কিছু হয়ে থাকে, দায় স্বীকার করে নিচ্ছি। পাশাপাশি যারা একাত্তরকে আপন মনে করেন, অন্তত বাণিজ্যসামগ্রী হিসেবে মনে করেন না, তাদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকবেই।
 লেখক- সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক।




সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৬
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
কার্যালয়: কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশন, তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়,কুমিল্লা-৩৫০০, বাংলাদেশ
ফোন: +৮৮০ ৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২৪৪৩, +৮৮০ ১৭১৮০৮৯৩০২
ই মেইল: hridoycomilla@yahoo.com, newscomillarkagoj@gmail.com,  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশান।
তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : hridoycomilla@yahoo.com Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};