ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন অ্যাপস কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য লাইভ টিভি লাইভ রেডিও সকল পত্রিকা যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
ফুলকন্যা
Published : Thursday, 15 December, 2016 at 3:01 PM
ফুলকন্যাআনোয়ারুল হক
অনেক রাতে বাড়ি ফেরাই আমার নিয়ম হয়ে গেছে। ওই সময়টাকে সকাল বলে না কেউ। দিনের বারোটার পর ঘুম থেকে ওঠে গোছল করে নাস্তা খেয়ে আমার দিন শুরু হয়। রাতে ঘুমানোর জন্যে বিছানায় যখন পিঠ লাগাই তখন রাতের তৃতীয় প্রহর প্রায়ই পার করে দিয়ে। দেরীতে রাতে ঘরে ফেরা, ঘুমানো, খাওয়া-চলাফেরা এসবই আমার নিয়ম। এই অবস্থায় পিতৃমাতৃকুল শোধনের সব আশা বাদ দিয়ে অগতির গতি ভগবানের কাঁধে আমাকে অর্পণ করে এখন থিতু হয়ে বসে গেছেন। বুঝতে পারি।
আর আমি যে একটু নিয়মমত চলার চেষ্টা করিনি কখনো তা নয়। চেষ্টা করেছিলাম। তারপর আবার যে পূর্বাবস্থায় ফিরে গেলাম তার দায় তাাঁদেরই ছিল। কেউ যদি প্রশ্ন করেন কেন ?
তাহলে অবস্থাটা খুলেই বলা ভাল।
কী কারণে যেন একদিন ভাবলাম, এখন থেকে সবসময় বাড়ি ফিরতে আর রাত করবো না। সন্ধ্যা রাতে ঘরে থেকে লেখালেখি অথবা বই পড়ে কাটাবো। সেইমতো একদিন ঘরেই কাটিয়ে দিলাম সন্ধ্যেটা। বই পড়ে, ছবি এঁকে, আমার মাটির ঘরের দক্ষিণের সিঁড়িতে অলস সময় বসে বসে আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে সেই রাতটা দিব্যি পার করে দিলাম। পরে নিজেই মনে মনে নিজেকে বাহবা দিলাম, পারলাম তাহলে!
তারপর দিনও ভাবলাম, থাক না-আজও না হয় কান্দিরপাড় সুইট হোম, জলযোগ, পেড়া ভা-ারের আড্ডায় নাই বা গেলাম। তবুও দিনের অংশটুকু যথারীতি টাউনহলে কান্দিরপাড়ে আড্ডা দিয়ে সন্ধ্যার আগেই ঘরে ফিরলাম। হারিক্যানের আলোয় কাঠের খাটে হেলান দিয়ে শুয়ে বই পড়ছি।
বলে রাখি, এই বাড়িতে সাকুল্যে তিনটি মাটির ঘর। কুমিল্লা শহরের বাগিচাগাঁও ইউনিয়নের নতুন চৌধুরি পাড়ায় আমার বাসা। বাড়ির উত্তরে বিস্তৃত পাশাপাশি দুইটি কবরস্থান। দক্ষিণে মাঝারি আকৃতির কাক চক্ষু টলটলে জলের একটি পুকুর। তার দক্ষিণে আমাদের ধানী জমি। পূবেও ধানক্ষেত। ধান ক্ষেতের ওপাড়ে স্বর্ণকুটির, সর্দার বাড়ি,তার ওপারে বাগিচাগাঁও। এপারে পশ্চিমে আমাদের টিনের দরজা খুলে বের হলেই সদর রাস্তা উত্তরে দক্ষিণে এঁকে বেঁকে চলে গেছে এক মাথা অশোকতলার মোড়ে অপর মাথা দৈনিক রূপসী বাংলা পত্রিকা অফিস পার হয়ে দুইভাগে এক মাথা গেছে রেলস্টেশনের দিকে অপর মাথা পুলিশ লাইনের দিকে। আর বাড়ি জুড়ে আছে নানা জাতের ফুল ও ফলের গাছ-গাছালিতে ভর্তি ছায়া। পুকুরের দক্ষিণ পাড়ের মাটির ঘরটি বড়ঘর। ওটাতে আব্বা আম্মা, অন্য ভাইবোনেরা থাকে। বড়ঘরের  দক্ষিণের মাটির ঘরটি আমার একার।
কুমিল্লা জিলা স্কুলের পাঠ চুকিয়ে ভিক্টোরিয়া কলেজে পা দিতেই পিঠে দুটো পাখা গজিয়ে গেল। তাই দেখে জননী আমাকে আলাদা থাকার ব্যবস্থা করে চূড়ান্ত স্বাধীনতা দিয়ে দিলেন। তারপর থেকে আমি আমার মতো হয়ে গেলাম। জনক-জননীও  আমার কোন কাজের চলা-ফেরার  বিষয়ে কোন প্রশ্ন করতেন না। কেননা, আমাকে স্বাধীনতা দেয়ার আগে জননী বিশেষ কিছু অদৃশ্য বাঁধন আমার পায়ের ওপর পেঁচিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে আমার অনিয়মিত জীবন যাপনের মধ্যেও একটা নিয়ম ছিল। নিগড় ছিল যা আমি হেলা করতে পারতাম না।
যাই হোক,গতদিন সন্ধ্যার পর ঘরে ছিলাম। কোথাও গেলাম না। আজও ঘরে রয়ে গেছি। হারিকেনের আলোয় শুয়ে শুয়ে বই পড়ছি। উত্তরের বড় ঘর থেকে আম্মা বিষয়টি খেয়াল করেছেন। বাবা-মা কেউ পারতপক্ষে আমার মাটির ঘরে আসেন না, বলেছি। প্রয়োজনে বড় ঘরে ডেকে পাঠান। বই পড়তে পড়তে টের পেলাম আব্বা আমার মাথার কাছ দিয়ে এসে ঘরে উঁকি দিয়ে দেখে গেলেন। তার কিছুক্ষণ পর আম্মা এলেন।  উঁকি দিয়ে ফিরে গেলেন। তার দশ পনের মিনিট পর আবার এলেন। আমার মাথার কাছে এসে বসলেন। কপালে হাত দিলেন। বুঝলাম, জ¦রটর কিনা বুঝার চেষ্টা করলেন। জিজ্ঞেস করলেন,
-আমি ঘরে শুয়ে আছি কেন ?
আমার জবাবে তিনি সন্তুষ্ট হলেন না। যে ছেলে সারাদিন এবং রাতের চার ভাগের তিনভাগ প্রায়ই বাইরে থাকে সে যদি কোন অসুখ-বিসুখ ছাড়া সন্ধ্যার পর ঘরে শুয়ে বসে থাকে তাহলে জননীর সন্দেহ হতেই পারে। তাঁর অনুসন্ধানে আমি বিরক্ত হলাম। মাকে আশ^স্ত করে ‘ধেৎ তেরি’ বলে আবার আগের মত ঘর ছাড়লাম।
অবশ্য ভেবে দেখেছি, এই অনিয়মের মধ্যেও একটা নিয়মের সূত্র ঠিকই আছে। সংসারের নিয়মে হয়তো তা ঠিক নয় তবে জীবনের যোগফলে তার পরিণাম ভাল বৈ মন্দ হয়নি আমার জীবনে। তবে এইসব দার্শনিক তত্ত্ব কখনো কখনো ঠিক যে খাটে তাও না।
আর যে কারণে এত কথা বলা তা এই যে, আমি ঐ সময়ে কখনো সূর্যোদয় দেখেছি বলে আমার মনে পড়ে না। সকালে কোন পাখি আগে ডাকে,আমি বলতে পারবো না।
সেই আমি একদিন আধোরাতে ঘুমিয়েও খুব ভোরে ওঠে কাঠের দরজা খুলে উঠোনে এসে দাঁড়ালাম। বিস্ময়ে অভিভূত হলাম আমার মাটির ঘরের উত্তর কোণায় শিউলি গাছের তলায় মাটিতে ঝরে পড়ে থাকা অজ¯্র ফুল। শিশুর নরম গালের মতো কোমল। শীতের সকাল। অনুভবে একটা স্বর্গীয় সুখ  আমার শরীর মন ছুঁয়ে গেল। শিউলি সৌরভে আশপাশ ভরে আছে। প্রদোষের অন্ধকার এখনো পুরোপুরি কাটেনি। আমি মুগ্ধ।
এই সময় আমি ততধিক বিস্ময়ে লক্ষ্য করলাম, টিনের সদর গেইটের বন্ধ দরজার একপাশের ভাঙ্গা বেড়া গলিয়ে একটা ফুলের সাজি হাতে কিশোরি মেয়েটি সন্তর্পণে ঢুকলো ভিতরে। প্রথমে সে আমাকে দেখতে পায়নি। এমন হতে পারে সে হয়তো ভাবেওনি যে, এ ভোরে শিউলি তলায় সে কাউকে দেখতে পাবে। কোনদিন তো সে দেখে না!
অনাহুত কারো বাড়িতে ঢুকছে এ কারণে হতে পারে সে কুন্ঠিত। খালি পা। ধীরে ধীরে মেয়েটি ফুলের উঠানে এসে দাঁড়িয়ে নতজানু হওয়ার আগে আমাকে দেখতে পেল। ফিরে যেতে উদ্যত হতেই আমি আঙুলের ইশারায় তাকে নিষেধ করলাম। সে থমকে ফিরে দাঁড়াল। দেখলাম,কিশোরীর পরনে মানানসই রঙিন ফুলের ঘটি হাতা সেলোয়ার কামিজ। লম্বা চুলের দুই বেনী পিঠের ওপর, মাথায় লাল ফিতের ফুল। শ্যামলা রঙ, আয়ত চোখদুটো এখন তার মাটির দিকে নামানো। মুখে বলে হাতে  ইশারা করতেই শিউলি তলায় সে ফুল কুড়াতে নুয়ে বসলো।
কোথা থেকে সে এসেছে, কার মেয়ে, কে জানে ?
আমার পরিচিত নয় সে। এই মেয়েটিকে আমি চিনি না। তার হাতের চাঁপাকলির মতো আঙুল দিয়ে কিশোরী  ফুল কুড়াতে শুরু করলে আমিও তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। বড় ঘরে এখনও সবাই ঘুমে। হয়তো আম্মা নামাজ পড়ছেন। চারিদিকে অদ্ভুত একটা নীরবতা আর তারই ক্যানভাসে একটু দূরে আমি দাঁড়িয়ে আর সে শিউলি ফুল তুলছে। এক সময় সম্মোহিতের মতো আমিও ফুল তুলে তাকে দিলাম। সে ফুলের সাজি এগিয়ে দিয়ে ভরে নিল। তারপর যেভাবে মেয়েটি এসেছিল সেভাবেই সে ফিরে গেল।
সেদিন আমরা কেউ কোন বাক্য বিনিময় করলাম না।
পূজোর জন্যে, না কি এমনি এমনি মালা গাঁথবে বলে সে ফুল কুড়াচ্ছে। জানা হলো না।
আগামীদিন ভোরেও কি সে আসবে ?
বা তার নাম কি ?
কিছুই জিজ্ঞেস করা হলো না।
তবে আমি দেখেছি, কিশোরী ভাঙ্গা বেড়ার ওপারে গিয়ে একবার পিছন ফিরে তাকিয়েছিল। তার কমনীয় মুখে কোন প্রশ্রয়ের হাসি ছিল কি না আমি জানি না। কেননা অনতিদূর থেকে তা বুঝা যায়নি। আমিও এগিয়ে যাইনি পিছনে।
তবে, আমার মনের অজান্তেই বললে ভুল বলা হবে
আবার তার সঙ্গে দেখা হবে আশা করেই ডান হাত তুলে কিশোরীকে অস্ফুটে বলেছিলাম,
-আবার এসো।
দুই.   
আমার অনিয়মের রুটিনে হঠাৎ করেই নতুন নিয়ম যোগ হলো।
এরপরদিন অধিক রাতে ঘুমানোর পর যদি ভোরে সজাগ না হতে পারি এ কারণে জেগেই রইলাম সারারাত। এতে অবশ্য আমার কোন কান্তি বোধ হলোনা। একটা অজানা আগ্রহ উত্তেজনা শিহরণ আমাকে ঘিরে থার্মোমিটারের পারদের মতো ওঠানামা করেছে। তাতে মন্দ লাগছে না। গলায় সুর মনে আনন্দ যুগপৎ সঙ্গত করছে তালে। দেখতে দেখতে রাত গড়িয়ে গড়িয়ে ভোরের শুকতারার পায়ের কাছে এসে থেমে গেল।
তখন আমার মনে হলো, সে আসবে তো আজ ?
রাত জেগে ভোরের অপেক্ষায় ওর জন্যে বসে থাকা বৃথা যাবে না তো ?
জেনে গেছি বলে লজ্জ্বিত কুণ্ঠায় তার পা যদি আর এদিকে পথে না নামে ?
ওর মন সাড়া না দিলে ?
এইসব ভাবছি আর সদর দরজার ভাঙ্গা বেড়ার ফাঁকে চোখ রাখছি। আচ্ছা, জেনেই যখন গেছি তখন বেড়ার ফাঁক গলে এভাবে সে আসবে কেন ? সদর দরজা খুলে রাখলে হয় না ?
মনের ওপিঠ বললো- না,হয় না। এলে তাকে এভাবেই আসতে হবে। দরজা খুলে রাখলে বা তুমি খুলে দিলে লজ্জাবতী লতায় ছুঁয়ে দেয়ার মতো অবস্থা হবে। সে বুঝবে তুমি তাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছো। এতে সে গুটিয়ে যাবে। যেমন আছ তেমনি থাকো। তুমি কিছু জানো না। যদি সে জানতে পারে তুমি তার জন্যে অপেক্ষা করছো তাহলে কাল থেকে সে আর নাও আসতে পারে।
মনের এই জবাব শুনে আমার মন খারাপ হচ্ছিল।
একই মন আবার বললো,
-মন খারাপ করো না, অপেক্ষা করছো জেনে খুশিও হতে পারে। ফিফটি ফিফটি। কী করবে ভেবে দেখো।
ভোরের দিকে শীতের উঠোন শিশিরে যত ভিজে নরম হয় সেই সাথে ভোরের হাওয়ায় বের হওয়া মানুষের মনও নরম হয়ে বাতাসে ভাসে। দোলে। আমার মন দুলতে লাগলো।
সারারাত জেগে অপেক্ষা করার পর এখন আমার মন আর সায় দিলনা। একরাশ দ্বিধা টলোমলো পায়ে এগিয়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। ভাবলাম, থাক্।
পেয়ারার ডালে একটা টুনটুনি ডেকে ওঠলো। সে সাথে মৃদু পায়ের শব্দ এগিয়ে এলো শিউলি তলায়। টের পেয়ে দক্ষিণের সিঁড়ি থেকে ওঠে আমি পাখিদের কাছে গেলাম না। ঘরের ভিতরে ঢুকে বারান্দার দিকের জানালাটা একটু ফাঁক করে দেখলাম, অনতিদূরে কিশোরী গতকালের মতোই আপন মনে ফুল তুলছে সাজিতে। পূবালী রঙের জামা আর সাদা পাজামা তার পরনে। লাল ওড়নার নিচ দিয়ে দুটো বিনুনি পিঠের ওপর পাশাপাশি থির হয়ে আছে। নোয়ানো মাথা মাটির দিকে তাকিয়ে। শুধু তার শিল্পিত আঙুলগুলো একবার সাজিতে আরবার শিশিরে সবুজে নড়ছে।
ফুল কুড়ানো শেষ করে ফিরে যাওয়ার সময় আমার ঘরের দিকে মুখ তুলে সে তাকিয়ে দেখলো একবার। যদিও জানলো না সে, আমি তাকে দেখছি।
লঘু পায়ে শিউলি তলা ছেড়ে গেলে পর আমার দুচোখ জুড়ে রাজ্যের ঘুম নেমে এলো।
এরপর আমার বহু বিনিদ্র রজনী গেছে প্রভাতের পায়ে। যতদিন শিউলি তলায় ফুলেরা কারো অপেক্ষায় ছিল ততদিন সে এসেছে। ফিরে গেছে লঘু পায়ে কিশোরী।।
প্রতিদিন ভোরে তার ফিরে যাওয়ার আগে নোয়ানো মুখ তুলে তাকালেই আমি দেখতে পেতাম, তার চোখ। সকালের ¯িœগ্ধ শরীর।
সে জানতো না। দেখতে পেতাম ধ্রুবতারা নাকফুল।
সে আমাকে দেখতো না।
পরের শীতে তাকে আর দেখতে পেলাম না।
ইচ্ছে ছিল তবুও কোনদিন জানা হলো না তার নাম কী ?
কী এক দ্বিধায় যে জড়ালো আমার পা আমি জানি না ।  
উঠোনের ক্যানভাস থেকে কোন একদিন অজানা কিশোরী হারিয়ে গেলো। তারপর বহু বহু বছর। এতদিনেও  সে যে মন থেকে মুছে যায়নি তা টের পেয়েছি এক যুগ পর। হয়তো সেও। না হলে সে যেতে যেতে পিছন ফিরে বারবার তাকালো কেন ?    

তিন
প্রতি বছর ১৪ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে আমি দিবসের প্রথম প্রহরে ফুল দিতে যাই। সেবারও গিয়েছি। আমার হাতে গত সন্ধ্যায় কেনা দুই হাতে দুই তোড়া নানা জাতের ফুল। হালকা কুয়াশা শীতের ভোর। মোটামুটি নাতিবৃহৎ একটা লাইনের প্রায় শেষ প্রান্তে আমি দাঁড়িয়ে আছি। অপেক্ষা করছি আমার বন্ধু রাশেদের জন্যে। ফোন করে বলেছে, সেও আসবে। তাই ওর জন্যেও আমি একটি ফুলের তোড়া হাতে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছি।
দেরি করছে কেন বুঝতে পারছি না। আমার বিরক্ত লাগছে। ফোন দিলাম, কিন্তু সে ফোন ধরছে না। ভাবছি, হয়তো রাস্তায় আছে। দেখলাম, আমার দাঁড়িয়ে থাকার জায়গা থেকে একটু দূরে পাঁচজন কালো চওড়া পাড়ের সাদা শাড়ি,কপালে লাল টিপ, সুনয়না,সুদর্শনা দাঁড়িয়ে আছে। হতে পারে আমার মতোই কারও অপেক্ষায়, মনে করলাম। সবার হাতে গুচ্ছফুল, ফুলের তোড়া শোভা পাচ্ছে। একজন ছাড়া। শ্যামের রঙে তার মুখের আবীর।
তবে আমি শুনলাম, তাকে অন্যরা সাধছে ওদের সঙ্গে লাইনে দাঁড়াবার জন্যে। সে মাথা নেড়ে, শরীর বাঁকিয়ে অনীহা প্রকাশ করছে। বলছে, ফুল ছাড়া আমি ভিতরে যাবো না।
বন্ধুরা তাদের ফুল দিতে চাইলে জবাব দিচ্ছে,
-তোদের কাছ থেকে আমি ফুল নেবো না। আমার জন্যে আনিস্নি কেন ?
এদিকে ভিড় বাড়ছে। তাই দলের নেতা গোছের মেয়েটি চাইছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফুল দিয়ে ফিরে যেতে। এত সাধাসাধিতে কোন কাজ হচ্ছে না। কোন একজনের ভুলের জন্য এই বিপত্তি।
শ্যামলা লালটিপ ঠোঁট চেপে দাঁড়িয়ে থাকে। চোখ ছলছল।
এদিকে আমিও বন্ধুর অপেক্ষায় অধৈর্য হয়ে ওঠেছি।
ভাবছি,আর পাঁচ মিনিট দেখবো। তারপর ভিতরে ঢুকবো। আর অপেক্ষা করবো না।
চার মিনিটের মাথায় রাশেদের ফোন এলো,
-দোস্ত, মোহাম্মদপুরে বাসার সামনে ঝামেলা হচ্ছে। আসতে পারবো না। সরি, কিছু মনে করিস না।
মোবইল বন্ধ করে হতাশ মনটা তিক্ততায় ভরে ওঠতে দিলাম না।
আমি ফুলের তোড়া হাতে লাল টিপের জটলাটার দিকে এগিয়ে গেলাম। অভিমানী মেয়েটির দিকে ফুলের তোড়াটা এগিয়ে দিয়ে বললাম,
-নিন,ধরুন। তোড়াটি নিন। আমার বন্ধু আসবে না।
বিব্রত, কিছুটা লজ্জিত মেয়েটি মুখে কিছু না বলে বন্ধুদের দিকে তাকাল। ওরা সবাই কলকল করে হেসে, মাথা নেড়ে সায় দিল।-নে, নে না। বাহ্ !
আয়ত চোখের মেয়েটি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে স্মিত হেসে ফুলের তোড়াটা নিল।
আমার কেন জানি মনে হলো, আমি কি তাকে আগে কোথাও দেখেছি ?
ফুল হাতে নিয়ে পাথরের মেঝেতে মার্বেল গড়িয়ে পড়ার মতো হাসতে হাসতে দল বেঁধে ওরা লাইনে গিয়ে দাঁড়াল। আমি এক জোড়া দম্পতির পিছনে।  
বুদ্ধিজীবী গোরস্তানে ঢুকতে ঢুকতে মেয়েটি তিনবার হাসিমুখে পিছন ফিরে আমার দিকে তাকাল।
চতুর্থবার সে তাকাবে মনে করে আমি লাইন ভেঙ্গে সরে এলাম আরও পিছনে।
আমার বুক কাঁপছে।
এক যুগ আগে কোন এক শীতের সকালে কেঁপে ওঠেছিল যেমন।  
০৬.১২.২০১৬
বসধরষ: ধহধিৎঁষযধয়ঁবপস@মসধরষ.পড়স    




সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৬
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
কার্যালয়: কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশন, তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়,কুমিল্লা-৩৫০০, বাংলাদেশ
ফোন: +৮৮০ ৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২৪৪৩, +৮৮০ ১৭১৮০৮৯৩০২
ই মেইল: [email protected], [email protected],  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশান।
তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : [email protected] Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};