ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন অ্যাপস কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য লাইভ টিভি লাইভ রেডিও সকল পত্রিকা যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
শহিদ আবুল কাশেম চৌধুরী
Published : Thursday, 15 December, 2016 at 3:01 PM
মোতাহার হোসেন মাহবুব।
মুক্তিযুদ্ধকালীন শহিদ আবুল কাশেম চৌধুরী আমার প্রাথমিক শিাজীবনের শিক ছিলেন। ১৯৬৫-১৯৬৮ এ চার বছর আমি কাটাবিল ফ্রি প্রাইমারি স্কুলের ছাত্র ছিলাম। ওই সময়ে আবুল কাশেম চৌধুরী এ স্কুলের প্রধান শিকের দায়িত্ব পালন করেন। আমরা তাঁকে ‘হেড স্যার’ বলে সম্বোধন করেছি। তিনি অত্যন্ত বিনয়ী ছিলেন। রাগ করে উচ্চবাক্যে কথা বলতে কখনো শুনিনি। তিনি বুনিয়াদী মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জমিদার আমীর মোহাম্মদ চৌধুরীর উত্তর-পুরুষ ছিলেন। প্রাথমিক শিা জীবনে আমি শ্রেণি পরীার ফলাফলে সব সময় প্রথম স্থান অর্জন করেছি। ভালো ফলাফলের কারণে আমাকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়তে হয়নি। প্রথম শ্রেণি থেকে অটো প্রমোশন এর সুবাদে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সুযোগ হয়। এ সুযোগটি প্রধান শিক আবুল কাশেম চৌধুরীই করে দিয়েছিলেন। পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি পরীা দেয়ারও সুযোগ হয়েছিল। ভালো ছাত্র হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার সকল সুযোগই ‘হেড স্যার’ করে দিয়েছিলেন। সেই প্রিয় হেড স্যার আবুল কাশেম চৌধুরী যে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গুলিতে শহিদ হয়েছেন, তা জেনেছি অনেক পরে। সম্ভবত ২০১০ সালের কোনো এক সময়। আমার গ্রামের পার্শ্ববর্তী হযরত পাড়ার কাজী মোহাম্মদ আলমগীরের কাছ থেকে।  সে বলেছিল, ‘১৯৭১ সালের কোনো এক সময় কাটাবিল প্রাইমারি স্কুলের এককালীন প্রধান শিক আবুল কাশেম চৌধুরীকে পাকিস্তানি আর্মি গুলি করে হত্যা করেছিল, এ খবরটি আমি তাঁর ছেলে নাসির ভাইয়ের কাছ থেকে শুনেছি। তিনি আমার প্রতিবেশি আপনি তো এ স্কুলের ছাত্র ছিলেন, স্যারের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে একটি লিখা লিখতে পারেন। এ ব্যাপারে নাসির ভাই আপনাকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করবেন।’ ২০০৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক আমার প্রথম গ্রন্থ যুদ্ধদিনের কথা বের হয়। পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলা উপলে এ গ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। এরপর মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক গ্রন্থ লেখার উৎসাহ উদ্দীপনা অনেকটা বেড়ে যায় পাঠকের চাহিদা বৃদ্ধির কারণেই শুধু নয় একধরনের অন্তর তাগিদও অনুভব করি মর্মে মর্মে। আমার প্রিয় শিক আবুল কাশেম চৌধুরীর শহিদ হওয়ার ঘটনাটি অন্তরে ধারণ করলেও লিখায় সুযোগ হয়ে ওঠেনি। এরই মধ্যে আমাকে আরও ছয়টি বইয়ের কাজ করতে হয়েছে। ইতোমধ্যে মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যা বিষয়ক গবেষণা গ্রন্থ কৃষ্ণপুর-ধনঞ্জয় গণহত্যা গত বছর বের হয়েছে। এ বছর মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে দৈনিক কুমিল্লার কাগজ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয় আমার লেখা ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ডেট লাইন শ্রীহাস্য গ্রন্থটি। এ কথাগুলো উপস্থাপন করছি নিজেকে জাহির করার জন্য নয়। আসলে কর্মব্যস্ততার কারণে আবুল কাশেম চৌধুরী তথা আমার প্রিয় হেড স্যারের শহিদ হওয়ার ঘটনাটি লিখার সুযোগ হয়ে উঠেনি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নতুন প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করার লে এ কাজ অত্যন্ত জরুরি। স্যারের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো জরুরি। এ ভাবনা থেকেই এ অধ্যায়ে প্রবেশ।
দুই.
বৃষ্টির আশঙ্কায় ঈদের দিন ঈদের নামাজ আদায় করি নূরপুর গুধির পুকুর পাড় জামে মসজিদে। মসজিদের বারান্দায় দেখা হয় কাটাবিল পৌর অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক আমিন স্যারের সাথে। তাঁকে জিজ্ঞাসা করি, ‘আপনি যে-সময় কাটাবিল প্রাইমারি স্কুলের শিক ছিলেন সে-সময়ের প্রধান শিক আবুল কাশেম চৌধুরী- যাকে আমরা ‘হেড স্যার’ বলে ডেকেছি তাঁর বাড়ি কোথায়?’ তিনি কিছুণ চুপ থেকে বলেন, ‘তাঁর বাড়ি ঘিলাতলী চৌধুরী বাড়ি। তাঁকে ও তাঁর শ্বশুরকে পাঞ্জাবিরা গুলি করে হত্যা করেছে।’ বৃদ্ধ আমিন স্যার অনেকটা অসুস্থ শরীর নিয়ে ঈদের নামাজ আদায় করতে এসেছেন। ঠিকানা পাওয়ার পর অসুস্থ স্যারকে এ বিষয়ে আর প্রশ্ন করা সমীচীন মনে হয়নি। স্যারকে সালাম করে, দোয়া চেয়ে বিদায় নিই। বলি, পরে একসময় আপনার সাথে এ বিষয়ে কথা বলবো। মনে মনে স্থির করি, পরদিনই শহিদ আবুল কাশেম চৌধুরীর বাড়িতে যাবো। বিকেলে যাবার সিদ্ধান্ত নিই। পরদিন বেলা ১১টায় বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক বদরুল হুদা জেনু মুঠোফোনে জানান, তিনি বিকেলে বিবির বাজার হাই স্কুল মাঠে ফুটবল খেলা দেখতে যাবেন। বলি, আমিও যাবো তবে অন্য কাজে। একজন শহিদ শিকের সমাধিস্থল দেখতে ও তাঁর শহিদ হওয়ার ঘটনা জানতে। বিকেল ৪টায় বদরুল হুদা জেনু বিবির বাজার যাওয়ার পথে সিএনজি চালিত ট্যাক্সিতে আমাকে বসার সুযোগ দেন। ওখানে পৌঁছে যে যার গন্তব্যের দিকে পা বাড়াই। বিবির বাজার পৌঁছার আগে বদরুল হুদা জেনুর মুঠোফোনে কথা বলার পর ঘিলাতলী চৌধুরী বাড়ির বাসিন্দা নজরুল গবেষক ও মুক্তিযোদ্ধা ড. আলী হোসেন চৌধুরীকে ফোন করে ওই বাড়ির অবস্থান জেনে নিই। তাঁকে জিজ্ঞাসা করি, আপনি ওই বাড়িতে আছেন কিনা? তিনি বলেন, ‘ঈদের দিন গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলাম।’ বুঝে নিই, তাঁকে ওখানে পাবো না। ড. আলী হোসেন চৌধুরীর দেয়া তথ্যানুযায়ী গন্তব্যের দিকে রিক্সা যোগে রওয়ানা দিই। তিনি বলেছিলেন, বিবির বাজার থেকে এক কিলোমিটার পূর্বে চৌধুরী বাড়ির অবস্থান। পথে জহুরের নেছা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পেরিয়ে একটি মুদি দোকানের সামনে একজন মুরব্বীকে বাড়ির অবস্থান সম্পর্কে জেনে নিই। তিনি রিক্সাচালককে বলে দেন কিভাবে যেতে হবে। এর আগে কটকবাজার রাস্তা ছেড়ে রিক্সা যখন ডান দিকে ঘুরছিল তখন বাঁ দিকে একটি স্মৃতিফলক চোখে পড়ে। রিক্সা থেকে নেমে ফলকের গায়ে লিখাটি পড়ে নিই, তাতে লিখা রয়েছে ‘...সংগ্রামের বীরমুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে/মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ/ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন/ ...মোহাম্মদ আবু তাহের/.../.../১৩ জুলাই ২০০৯। ডটডট দেয়া জায়গার লেখাগুলো বুঝা যায়নি। পলেস্তরা বিপন্ন। মুরব্বীর কথানুযায়ী রিক্সাচালক রিক্সা চালিয়ে কিছুদূর এগিয়ে পিচঢালা রাস্তা ছেড়ে ডানদিকে ইট বিছানো পথে এগিয়ে যায়। রাস্তার পাশে বেশ কয়েকটি দিঘি ও বড় পুকুর নজরে পড়ে। শান্ত-নিবিড় ছায়াঘেরা সবুজাভ পরিবেশের মধ্যদিয়ে রিক্সা একসময় গন্তব্যস্থল- ঘিলাতলী চৌধুরী বাড়ির সামনে পৌঁছে। রিক্সা থেকে পাকা উঁচু ভিটি সমেত একটি ঘরে খাটের উপর বসা একজন বৃদ্ধাকে সালাম জানিয়ে জিজ্ঞাসা করি- ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে এ বাড়ির তিনজনকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গুলি করে হত্যা করেছিল, তাদের সম্পর্কে আপনি জানেন কি? বৃদ্ধা চোখ বড়বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘তাদের একজন আমার স্বামী ছিলেন, তার নাম আবদুল মালেক চৌধুরী।’
কিছুণ চুপ থেকে বলেন, ‘অন্য দুজনের মধ্যে একজনের নাম আলী হোসেন চৌধুরী ও আরেকজনের নাম আবুল কাশেম চৌধুরী।’
বৃদ্ধা খাট থেকে নেমে দাঁড়িয়ে আঙ্গুল দিয়ে কোণাকুনি ইঙ্গিত করে বলেন, ‘ওই সামনের বাড়ির উঠানে তাদের তিনজনকে গুলি করে হত্যা করেছিল পাঞ্জাইব্বরা (পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী)। ওই বাড়ির সামনেই তাদের তিনজনকে একটি কবরে কবর দেয়া হয়।’
বলি, আমি আগে ওই কবরটি দেখে আসি। এরপর আপনার সাথে আবারও কথা বলবো। রিক্সাচালককে বলি, ওই বাড়ির সামনে নিয়ে যেতে। ওখানে পৌঁছতেই প্রথমে নজরে পড়ে সেই গণকবরটি। যেখানে একই কবরে শায়িত আছেন তিনজন শহিদ। রিক্সাভাড়া ২৫ টাকা দিয়ে রিক্সাচালককে বিদায় দিই, প্রথমে শহিদদের সমাধিস্থলের পরপর কয়েকটি ছবি ক্যামরাবন্দি করি। পলেস্তরা খসা সমাধিস্থলে লিখা আছে ‘কুখ্যাত ইয়াহিয়ার সৈনিক দ্বারা গুলিবিদ্ধ তিনটি সহিদান’। অবহেলায় অযতেœ এবং অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় সমাধিস্থলটি দেখে মনে খুব কষ্ট হলো। কষ্ট হলো- সমাধিস্থলে দেখা ভুল বানানসমেত বাক্যটি পড়ে। প্রকৃতপে এখানে লিখা প্রয়োজন ছিল ‘তিনটির’ স্থলে ‘তিনজনের’ ও ‘সহিদান’ এর স্থলে শহিদ। এরপরও কৃতজ্ঞতা জানাই তাদের- যারা পাকা দেয়াল তৈরি করে এ সমাধিস্থলটি সংরণ করেছেন। তবে এ সমাধিস্থল বা গণকবরটি জরুরিভিত্তিতে জাতীয় পর্যায়ে সংরণ প্রয়োজন। কারণ এটি মুক্তিযুদ্ধের চুষ্মান উপমা বা উপাত্ত। গণকবরের ছবি তোলার পর পেছনের বাড়িতে প্রবেশ করি। অনেকটা নির্জন, বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে ‘বাড়িতে কে আছেন’ বলে বেশ কয়েকবার ডাকাডাকি করার পর একজন মহিলা আসেন। তাকে এ বাড়ির তিনজন শহিদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ‘আমি ঘটনার সময় এ বাড়িতে ছিলাম না মানে আমার তখন বিয়ে হয়নি। বিয়ের পর জেনেছি এ বাড়ির দুইজন ও পাশের বাড়ির একজনকে এ উঠোনে পাঞ্জাবিরা গুলি করে হত্যা করছে।’ তিনি বলেন, ‘আবুল কাশেম চৌধুরীর ঘর এ বাড়ির দণি ভিটির পাকা ঘর ও আলী হোসেন চৌধুরীর যা পূর্বভিটির মাটির ঘর।’ তিনি আরও জানান, ‘আবুল কাশেম চৌধুরী সেদিন দুধ দিয়ে ভাত খেতে বসেছিলেন। এসময় পাঞ্জাবিরা বাড়ি ঘেরাও করে ভাত খাওয়া অবস্থায় আবুল কাশেম চৌধুরীকে ঘর থেকে বের করে উঠোনে দাঁড় করায় এবং আলী হোসেন চৌধুরী ও আবদুল মালেক চৌধুরীকেও উঠোনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে। তারা তিনজন ভারতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে ছিলেন। একজন রাজাকার পাঞ্জাবিদের এ বাড়িটি দেখিয়ে দিয়েছিল।’
আগেই বলেছি, তিনজন শহিদের মধ্যে আবুল কাশেম চৌধুরী আমার শিক ছিলেন। তার চেহারা আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মহিলার কাছে স্যারের এভাবে মারা যাওয়ার বিবরণ শুনে এতবছর পরও কান্না থামাতে পারিনি। মহিলা বলেন, ‘আবুল কাশেম চৌধুরী পাতের ভাত খেতে পারেন নি, টেনে হেঁচড়ে তাঁকে ঘর থেকে বের করা হয়।’
মহিলাকে জিজ্ঞাসা করি, স্যারের স্ত্রী ঘরে আছেন কিনা?
তিনি বলেন, নেই। ছেলের বাড়ি বেড়াতে গেছেন।
ছেলের বাড়ি কোথায়?
: ছেলের বাড়ি বলতে ওই বাড়িটি আবুল কাশেম চৌধুরীই জীবৎকালে শহরের হযরত পাড়া এলাকায় ক্রয় করেছিলেন। ওখানেই স্যারের ছেলেমেয়েরা থাকেন। তখনই মনে পড়ে কাজী মোহাম্মদ আলমগীরের কথা। সে বলেছিল, তার প্রতিবেশি।
মহিলার সাথে আর কোনো কথা না বলে হেড স্যারের বসত ঘরের ছবি ও উঠোনের ছবি তুলি যেখানে স্যারসহ তিনজনকে গুলি করে হত্যা করেছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। এরপর আবারো শহিদ আবদুল মালেক চৌধুরীর বাসায় আসি। তাঁর স্ত্রী বয়োবৃদ্ধা রোশন আরা বেগম আমাকে দেখে তার ছেলের বৌকে বলেন, ‘সাংবাদিক এসেছেন। আমাদের সাথে কথা বলবেন।’ আমি সোফায় বসতে ঘরে আরেকজন প্রতিবেশি ভদ্রমহিলা প্রবেশ করেন। তারা তিনজনই আমার বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। প্রথমে রোশন আরা বেগমকে জিজ্ঞাসা করি- ঘটনার দিন, ১৯৭১ সালে যেদিন আপনার স্বামীকে গুলি করে হত্যা করেছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তখন আপনি কোথায় ছিলেন?
তিনি বলেন, আমি তখন এ বাড়িতে ছিলাম না।
তখন আপনার সাথে কে কে ছিল?
: আমার ২ ছেলে ১ মেয়ের মধ্যে সবাই আমার সাথে ছিল। আমার ছোটমেয়ের বয়স তখন মাত্র এক মাস ছিল। সেদিনের বর্বরোচিত এ ঘটনার প্রত্যদর্শী কারা ছিলেন?
: যারা দেখেছেন, তাদের অনেকেই মারা গেছেন। যিনি তাদের তিনজনকে জানাজা দিয়েছিলেন তিনিও বেঁচে নেই। তার নাম হাকিম মোল্লা। তিনি ১০-১২ বছর আগে মারা গেছেন। রোশন আরা বেগম অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলেন, এতো বছর পর আপনি খোঁজ নিতে এসেছেন। আপনার স্যার আবুল কাশেম চৌধুরী মারা যাওয়ার পর কত কষ্টে যে তাঁর স্ত্রী ছেলেমেয়েদের মানুষ করেছেন- একথা বলেই তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। তাঁর ছেলের বৌ আমাকে জিজ্ঞাসা করেন- এত বছর পর কেন তিনজন শহিদ সম্পর্কে জানতে এসেছি। বলি, মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস এখন লিখা হচ্ছে। নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানাতে আমি মুক্তিযুদ্ধের উপরে কাজ করছি।
তাদের কাছ থেকে ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানার সুযোগ নেই বলে বিদায় নিয়ে হযরত পাড়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়ার আগে তিনজন শহিদের গণকবর জিয়ারত করি ও আরও কয়েকটি ছবি তুলি।
তিন.
বিবির বাজার এসে দেখি তখনো ঈদোত্তর আনন্দ উৎসব হিসেবে বিবির বাজার হাই স্কুল মাঠে বিবাহিত বনাম অবিবাহিত দলের ফুটবল প্রতিযোগিতা চলছে। পুরস্কার বিতরণের কয়েকটি ছবি তুলে বদরুল হুদা জেনুর সাথে চকবাজারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলেও নূরপুর চৌমুহনীতে ট্র্যাক্সি থেকে নেমে যাই। ওখান থেকে নিজ বাড়িতে না গিয়ে সোজা হযরতপাড়া পৌঁছি। প্রথমে কাজী মোহাম্মদ আলমগীরের সাথে দেখা করি। সে জানায়, শহিদ আবুল কাশেম চৌধুরীর ছেলে অ্যাডভোকেট নাসির উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী অসুস্থ। পরণে বলে, তবু আপনি দেখা করতে পারেন।
কাজী মোহাম্মদ আলমগীরের সাথে ওই বাড়ির সামনে গিয়ে অ্যাডভোকেট নাসির উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বাসায় আছেন কিনা প্রশ্ন করতে একজন মহিলা বলেন, বাসায় আছেন। কাজী মোহাম্মদ আলমগীর বাসার প্রধান ফটকের সামনে থেকে বিদায় নেন। আমি গেটের ভিতরে প্রবেশ করতে দরোজার সামনে দাঁড়িয়ে নাসির উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী আমাকে বাসার ভিতরে বসার জন্য বলেন। কে প্রবেশ করে মনে হলো এটি ছোট আকারের বঙ্গবন্ধু জাদুঘর। চারদিকের দেয়ালে বঙ্গবন্ধু, তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী পরিবারের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের ছবি টানানো যাদের সাথে বঙ্গবন্ধুর আন্তরিকতা ছিল গভীর।
অ্যাডভোকেট নাসির আহমেদ চৌধুরী জানান, তার পিতা আবুল কাশেম চৌধুরীকে ১৯৭১ সালের ৯ মে বিকেল ৪টায় বসত ঘর থেকে ধরে এনে যখন উঠোনে গুলি করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তখন তিনিও তার পিতার সাথে ছিলেন, তবে গুলি করার আগ মুহূর্তে তাকে তার পিতা ধমক দিয়ে সরিয়ে দেন এবং পালিয়ে যেতে বলেন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ওই মুহূর্তে তার নানা শিক্ষক আলী হোসেন চৌধুরীকে তার ঘর থেকে (পূর্ব পাশের মাটির ঘর) ধরে আনতে ব্যস্ত ছিল। বাবার ধমক খেয়ে নাসির আহমেদ চৌধুরী দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যে গুলির শব্দ শুনতে পান। গুলি করে তিনজনকে হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী চলে যাবার পর তিনি বাড়িতে ফিরে দেখেন তার বাবা আবুল কাশেম চৌধুরীর বুকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গুলি করেছে। বুকের দু’পাশে গুলি লেগেছে, তস্থান দিয়ে গড়গড় করে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আমার নানা আলী হোসেন চৌধুরীর মাথায় গুলি করেছিল। গুলিতে তার মাথার খুলি উড়ে যায়। আবদুল মালেক চৌধুরীর মাথায়ও গুলি লেগেছিল।
 ১৯৭১ সালে আপনার বয়স কত ছিল?
এ প্রশ্নের উত্তরে নাসির উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, আমি ১৯৫৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেছি। একাত্তর সালে আমার বয়স হয়েছিল ১৩ বছর।
ভাইবোনদের মধ্যে আপনি তো সবার বড়?
: আমরা এক ভাই, দুবোন। বোনেরা আমার চেয়ে ছোট। আমার ছোট বোনের নাম পেয়ারা বেগম চৌধুরী ও সবার ছোট বোনের নাম নাজমা বেগম চৌধুরী।
আপনার বাবা মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে কি কাজ করতেন?
: বেশিরভাগ সময় বাড়িতেই থাকতেন। মাঝে মাঝে সাইকেলে চড়ে কাটাবিল প্রাইমারি স্কুলে আসতেন। এ স্কুলের তিনি প্রধান শিক ছিলেন। গুলি করে হত্যার ২-৩ দিন আগে বাবা ভারতে চলে যাবার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। এ ল্েয আমার চাচা আবদুল মালেক চৌধুরী আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। আমার বাবা, নানা ও চাচার ভারতের যাওয়ার প্রস্তুতি রাজাকাররা জেনে গিয়েছিল। লোকমুখে শুনেছি, আমাদের বাড়িটি পাকিস্তানি আর্মিকে রাজাকাররা দেখিয়ে গিয়েছিল, এমনকি একজন রাজাকার পাকিস্তানি আর্মির সাথেও ছিল।
সেই রাজাকার কে ছিল মানে তার নাম জানেন?
: তার নাম মনে নেই।
যে মৌলভী আপনার বাবাসহ তিনজন শহিদকে দাফন করেছিল তার নাম জানেন?
: তিনি আমার মামা ছিলেন। তার নাম মৌলভী আবদুল হাকিম।
আপনার বাবাসহ তিনজনকে যখন গুলি করেছিল তখন বাড়িতে আর কেউ ছিল না?
: আমার বৃদ্ধ দাদা ছিলেন। তিনি অন্ধ ছিলেন। তাকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গুলি না করলেও ভীষণ অত্যাচার করেছে।
আপনার বাবাকে গুলি করার সময় যে রাজাকার এসেছিল সে ছাড়া আর কোনো রাজাকারকে জানেন কিংবা চিনতেন কিনা?
: ঘিলাতলী দিঘির পশ্চিম পাড়ে মোঃ সামছু মিয়া নামে একজন রাজাকার ছিল। আপনার বাবাসহ তিনজন শহিদ হওয়ার ঘটনার প্রত্যদর্শী আর কেউ আছেন কি?
: প্রত্যদর্শীদের কেউ বেঁচে নেই। আমার মামা মৌলভী আবদুল হাকিম বেঁচে থাকলে কিছু তথ্য জানাতে পারতেন। আসলে সবাই তো তখন নিজেদের জীবন বাঁচাতে ব্যস্ত ছিল।
আপনার বাবার লেখাপড়া সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন-
: শুধু এটুকু জানি, তিনি ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্র ছিলেন।
আপনাদের এ বাড়িটি হেড স্যার কবে খরিদ করেছিলেন?
: ১৯৬৩ সালে, জায়গায় পরিমাণ ১০ শতক। তিনি বাড়িটি সে-সময় খরিদ করেছিলেন বলে আমরা শহরে মাথা গুজার ঠাঁই পেয়েছি।
গ্রামের বাড়ির সয়-সম্পত্তি কতটুকু?
: এ প্রশ্নে তিনি ােভ প্রকাশ করে বলেন, রাজাকারের উত্তরসূরিরা আমার বাবার কোটি টাকার সম্পত্তি দখল করে রেখেছে। একজন শহিদ পরিবারের সন্তান হয়েও ওইসব জমি পুনরুদ্ধার করতে পারি নি।
আপনার মায়ের সাথে কথা বলতে চেয়েছিলাম...
: তিনি অসুস্থ। কথা বলতে পারেন না।
কি যেন তাঁর নাম?
: অজুফা খাতুন চৌধুরানী।
আপনার মাকে আমার সালাম জানাবেন। আপনি কথা বলেছেন, সেজন্য আপনাকে ধন্যবাদ। ফিরতি পথে ভাবতে থাকি এ দেশে যাদের সম্মান পাওয়ার কথা তাদের ক’জন সম্মান পাচ্ছেন? প্রকৃত সম্মান পাওয়ার দাবিদারদের কী আমরা যথাযথ সম্মান জানাতে পারছি? এ ব্যর্থতা আমাদের। আমার শিক হেড স্যার শহিদ আবুল কাশেম চৌধুরী, একই সাথে শহিদ আলী হোসেন চৌধুরী ও শহিদ আবদুল মালেক চৌধুরীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।
চার.
গত ২৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় কুমিল্লা কাবে মুক্তিযোদ্ধা ড. আলী হোসেন চৌধুরীকে ঘিলাতলী চৌধুরী বাড়ির গণকবর তথা তাঁর আত্মীয় তিনজন শহিদের সমাধিস্থল ও নির্মম এ ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ‘ঘটনার দিন আমি বাড়িতে ছিলাম না। আমি ও আমার জেঠাত ভাই মুরাদনগর গিয়েছিলাম। ওখান থেকে আমার তালতো ভাই কুমিল্লা জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড ইউনিটের ডেপুটি কমান্ডার গিয়াস উদ্দিন খানের বাড়িতে এসে শুনি আমাদের গ্রামের বাড়ি- ঘিলাতলী চৌধুরী বাড়িতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হামলা চালিয়ে আমার চাচা আবদুল মালেক চৌধুরীসহ তিনজনকে গুলি করে হত্যা করেছে। আমার চাচা ুদ্র ব্যবসায়ী ছিলেন ও ডাক বিভাগের সাথে যুক্ত ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমার একটাই দাবি- চৌধুরী পরিবারের শহিদদের গণকবরটি সংরণের উদ্যোগ নেয়া হোক।’
বলি, গত ১৪ সেপ্টেম্বর ঈদ-উল-আযহার পরদিন আপনাদের বাড়িতে গিয়েছি। ওখানে আপনার চাচী রোশন আরা বেগমের সাথে কথা বলেছি। তিনি অসুস্থ। এরপরও বেশকিছু তথ্য জানিয়েছেন এ বিষয়ে আরও কিছু তথ্যের প্রয়োজন- তিনি বলেন, ‘আমার চাচাতো ভাই আমিন ঢাকায় থাকে তার সাথে যোগাযোগ করলে সে আরও কিছু তথ্য দিতে পারবে।’
মুঠোফোন নম্বর জেনে সালাম জানিয়ে ঢাকায় ফোন করতে মুক্তিযোদ্ধা ড. আলী হোসেন চৌধুরীর চাচাতো ভাই মোঃ আমিনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘আমরা ২ ভাই ১ বোন। আমার ছোট ভাইয়ের নাম আবদুর রহমান চৌধুরী তমিজ। এলাকায় সে তমিজ নামে পরিচিত। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে আমাদের বাড়িতে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হামলা চালায় তখন আমরা মায়ের সাথে নানার বাড়িতে ছিলাম। আমার বয়স তখন ৭ বছর। আমাদের নানার বাড়ি সুয়াগাজির সাতবাড়িয়া চৌধুরী বাড়ি। ওখানে আমরা শুনতে পারি বাবাকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গুলি করে হত্যা করেছে। মা ও ভাই-বোন কেউ বাবার মৃতমুখ দেখিনি। আমার মায়ের ১৩-১৪ বছরে বিয়ে হয়েছিল। ১৮ বছর বয়সে তিনি বিধবা হন। বাবার মৃত্যু সংবাদ মা সহ্য করতে পারেন নি। ৩ মাস অসুস্থ ছিলেন। আপনার বাবাসহ তিনজন শহিদ হওয়ার ঘটনার প্রত্যদর্শীদের কেউ বেঁচে আছেন কিনা?
: একজন বেঁচে আছেন আমাদের পাশের বাড়ির নজরুল ইসলাম খান সংেেপ এন আই খান। তাঁর ফোন নম্বর কি আপনার জানা আছে?
: আছে। আমি ম্যাসেজ করে দিচ্ছি।
এন আই খানকে বেশ কয়েকবার ফোন করেও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি। প্রায় ২০ মিনিট পর তিনি রিং ব্যাক করেন এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেন। তিনি বলেন, ‘আমিনের বাড়ির পাশেই আমাদের বাড়ি ছিল এবং যে বাড়িতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ৩ জনকে গুলি করে হত্যা করেছিল এর উত্তর দিকের বাড়িটিই আমাদের। ঘটনার দিন অর্থাৎ ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের শেষের কোনো একদিন আমি, বাবা ও ছোট ভাই দুপুরের পর আমাদের বাড়ির সামনে আম গাছের ছায়ায় বসে কোনো কাজের পরিকল্পনা করছিলাম। এমন সময় দেখি আমিনদের বাড়ি থেকে কয়েকজন পাকিস্তানি আর্মি দৌড়ে আসছে। আমিনের চাচা তোফায়েল আহমেদ চৌধুরী স্বাস্থ্যবান ছিলেন, মাথার চুল ছোট সাইজের ছিল। তাকে অনেকটা পুলিশ অথবা আর্মির লোক মনে হতো। পাকিস্তানি আর্মি তাকে দেখে মুক্তিবাহিনীর লোক মনে করে ধরতে গেলে সে দৌড়ে আবুল কাশেম চৌধুরীর বাড়িতে ঢুকে যায়। পাকিস্তানি আর্মি তাকে ফলো করে ওই বাড়িতে প্রবেশ করে। পাকিস্তানি আর্মি দেখে আমরা দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করিনি। কারণ দৌড় দিলে সন্দেহবশত গুলি করতে পারে। আমাদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ঘটনা দেখেছি। পাকিস্তানি আর্মিরা আমিনের চাচা তোফায়েল আহমেদ চৌধুরীকে ফলো করে দৌড়ে আসার সময় আমিনের আব্বা আবদুল মালেক চৌধুরীকেও ধরে নিয়ে আসে। তিনি শারীরিক দিক থেকে অনেকটা কুঁজো ছিলেন। তিনি চিঠি বিলি করতেন।’
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আর্মি ক’জন ছিল?
: ৫ থেকে ৬ জন ছিল। তাদের দেখে আমরা দৌড় না দিলেও সতর্ক ছিলাম। তারা আলী হোসেন চৌধুরীর বাড়িতে প্রবেশ করে। বাড়ির পূর্বদিকের ঘরটি আলী হোসেন চৌধুরীর এবং দণি ভিটির পাকা ঘরটি তার ভাতিজা আবুল কাশেম চৌধুরীর। আমিনের চাচা তোফায়েল ওই বাড়িতে দৌড়ে ঢুকে পেছন দিক দিয়ে ধানেেতর মধ্য দিয়ে পালিয়ে যায়। পাকিস্তানি আর্মিরা তাকে খুঁজতে গিয়ে দণি ভিটির ঘরে প্রবেশ করে আবুল কাশেম চৌধুরীকে ধরে আনে। ওই সময় ওইঘরে আবুল কাশেম চৌধুরীর চাচা আলী হোসেন চৌধুরীও ছিলেন। ওইঘরে একটি লোহার বাক্স ছিল- অনেকে বলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন এ বাক্স- গুলির বাক্স হিসেবে ব্যবহার হয়েছে। ওই বাক্সে চিঠিপত্র রাখা হতো। এটি দেখে পাকিস্তানি আর্মি ভেবেছিল এ বাড়িতে মুক্তিবাহিনীর লোক আছে অথবা এ বাড়ি মুক্তিবাহিনীর আস্তানা। এছাড়া তোফায়েল হোসেন চৌধুরীকে খুঁজে না পেয়ে তারা প্তি হয়ে যায়। এসব কথা আমরা ঘটনার পরে জেনেছি। যা বলছিলাম, একটু পর গুলির শব্দ হয়। গুলির শব্দ শুনে আব্বা বলেন, দেখি কি হয়েছে? আমি ছোট ভাইকে অনেকটা ধমক দিয়ে আমাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিই। এরপর আমরা দুজন অনেকটা সাহস নিয়ে আলী হোসেন চৌধুরী বাড়ির সামনে আসতে দুজন পাকিস্তানি আর্মি বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে একজন আরেকজনকে মোহাম্মদ আলী নামে ডেকে আমাদের দিকে তাকায়। মোহাম্মদ আলী সম্ভবত পাকিস্তানি আর্মি এ দলের কমান্ডার ছিল। পাকিস্তানি কমান্ডার আমাদের লাইনে দাঁড়াতে বলেন। সে আমার হাতে একটি পোস্ট কার্ড দিয়ে পড়তে বলে। আমি উর্দু ভাষা না জানলেও বুঝতে পেরেছিলাম আমাকে পড়তে বলা হয়েছে। আমি বাংলাতে বলি, জানিনা। এতে পাকিস্তানি আর্মি প্তি হয়ে আমার গালে জোরে চড় মারে। আব্বা বলেন, আমরা মুসলমান, আমাদের মারছো কেন? আব্বা লেখাপড়া তেমন না জানলেও সৎসাহসের সাথে কথা বলতে পারতেন। পাকিস্তানি আর্মি আমাদের বলে, কোদাল আনো, কবর খুঁড়তে হবে। তখন বুঝতে পারি আমিনের বাবা, চাচা ও দাদাকে পাঞ্জাবিরা গুলি করে হত্যা করেছে। এ সময় পাশের বাড়ি থেকে পাকিস্তানি আর্মি আরও ২-৩ জনকে ধরে আনে। আর্মিরা হুজুর আছে কিনা জিজ্ঞাসা করে। কে জানি বলে এ বাড়ির পশ্চিমে একজন হুজুর আছেন। তখন পাশের বাড়ি থেকে মাওলানা আবদুল হাকিমকে ধরে নিয়ে আসে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। আমাদের দিয়ে কবরের মাটি কাটানো হয়। মাটি কাটা অবস্থায় পাকিস্তানি আর্মিরা চলে যায়। তারা চলে যাবার পর সামছু মিয়া নামে একজন লোক আসে। সে চোরাকারবারি ছিল। মুসলিম লীগ করতো।
সে এসে বললো, আহরে! লোকগুলোকে মেরে ফেললো। আমি থাকলে মারতে দিতাম না। উপস্থিত সবার ধারণা এই সামছু মিয়াই পাকিস্তানি আর্মিকে এ বাড়ি দেখিয়ে দিয়েছিল। সামছু মিয়া বলে, পাকিস্তানি আর্মি আবার আসতে পারে। তাড়াতাড়ি এক কবরে তিনজনকে দাফন করে ফেলেন।
তখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ভয়ে আমরা সবাই মিলে এক কবরে তিনজনকে দাফন করে ফেলি।’
জানাজা হয়েছিল...
: হয়েছিল। মাওলানা আবদুল হাকিম জানাজা পড়ান। পরে শুনেছি সামছু মিয়া পাকিস্তানি আর্মিদের দিয়ে এলাকার বহু মানুষের তি করেছে। ১৯৭১ সালের ৮ ডিসেম্বর সামছু মিয়াকে মুক্তিবাহিনী ধরে নিয়ে যায় এয়ারপোর্টে। ওখানে তার অর্ধেক শরীর মাটিতে পুঁতে ইট মেরে মাথা থেঁতলে মেরে ফেলে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানানোর জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। : আপনাকেও ধন্যবাদ। এর কিছুণ পর মোঃ আমিনুল ইসলাম চৌধুরী মুঠোফোনে জানান, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কুমিল্লায় কেটিসিসিএ প্রাঙ্গণে বিশাল জনসভায় বক্তব্য রেখেছিলেন। ওই সভার শেষ পর্যায়ে শহিদ পরিবারের অনুদান হিসেবে আমাদের পরিবারের তিন শহিদ পরিবারের প্রত্যেক পরিবারকে দু’শ টাকা দিয়েছিলেন। ওই সময় আমি নাসিরের মা ও নানীর সাথে অনুদানের টাকা গ্রহণ করেছিলাম। ওই অনুদানের কাগজপত্র সংগ্রহে রাখতে পারিনি। এত বছর আমাদের শহিদ পরিবারগুলোর খবরও কেউ নেয় নি। মুুক্তিযোদ্ধা ড. আলী হোসেন চৌধুরীর মতো তিনি বলেন, ‘শহিদ পরিবারের পে আমার বিনীত অনুরোধ অন্তত পে তিন শহিদদের গণকবরটিকে সংরণ করা হোক।’
একই দাবি এলাকাবাসীর, আমাদেরও। ঘিলাতলী চৌধুরী বাড়ির তিনজন শহিদের গণকবরটি জাতীয়ভাবে সংরণ করা হোক।




সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৬
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
কার্যালয়: কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশন, তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়,কুমিল্লা-৩৫০০, বাংলাদেশ
ফোন: +৮৮০ ৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২৪৪৩, +৮৮০ ১৭১৮০৮৯৩০২
ই মেইল: [email protected], [email protected],  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশান।
তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : [email protected] Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};