ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন অ্যাপস কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য লাইভ টিভি লাইভ রেডিও সকল পত্রিকা যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
মোহন শীলের লিখে যাওয়া বর্ননাতে
ধীরেন্দ্র দত্তকে গুলি করে হত্যা করেছিল সুবেদার আশরাফ
Published : Thursday, 15 December, 2016 at 1:22 PM

ধীরেন্দ্র দত্তকে গুলি করে হত্যা করেছিল সুবেদার আশরাফআবুল কাশেম হৃদয়।। ভাষা সংগ্রামের রূপকার, পাকিস্তানের গণপরিষদে বাংলা ভাষাকে অন্যতম ভাষা রূপে সরকারি স্বীকৃতির দাবি উত্থাপনকারী প্রবীণ রাজনীতিবিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে গুলি করে হত্যা করেছিল পাকিস্তানি বর্বর সেনাবাহিনীর কুমিল্লার ৫৩ ব্রিগেডির ১১৭ এফআইও ইউনিটের সুবেদার আশরাফ খান (আশরুপ)। ৯ এপ্রিল বিকালে হত্যার পূর্বে তাকে করা হয়েছিল নির্মম নির্যাতন। দেয়া হয়েছিল বৈদ্যুতিক সটও। নির্যাতনে ক্ষত বিক্ষত ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের মৃত্যুর আগে তাঁর ক্ষতে ‘আইডিন’ দিয়ে তুলা লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করা হয়েছিল। ১১৭ এফআইও ইউনিটের মেজর সেলিম খানের নির্দেশে কুমিল্লা থেকে ধরে আনা বিশিষ্ট বাঙালিদের ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলের পশ্চিম পাশে পাহাড়ের উপর গর্ত করে তার পাশে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করতো সুবেদার আশরাফ। প্রতিদিন বিকাল ৫টার পর চলতো এই হত্যাযজ্ঞ। সেখানেই হত্যা করা হয় এই সংগ্রামীকে।
স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী কুমিল্লা সেনানিবাসের সে সময়ের নরসুন্দর রমনী মোহন শীলের মৃত্যুর পূর্বে লিখে যাওয়া বর্ননাতে জানা গেছে এতথ্য। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে নবেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একমাত্র নরসুন্দর ছিলেন রমনী শীল। পাকিস্তানিরা তাদের প্রয়োজনের হত্যা করতে নিয়েও বাঁচিয়ে রেখেছিল তাকে। পুরো সেনানিবাসে ছিল তাঁর পদচারণা। প্রাণ হাতে নিয়ে দিয়েছেন মুক্তিবাহিনীতে অনেক তথ্য।  ২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি পরলোকগমনের ৫/৬ বছর পূর্বে তিনি আস্তে আস্তে মুক্তিযুদ্ধের সময় কুমিল্লা সেনানিবাসের এ ঘটনার প্রত্যক্ষ বিবরণ লিখে যান। তাঁর একমাত্র ছেলে রাখাল চন্দ্র শীলের কাছ থেকে পাওয়া গেছে এই অমূল্য দলিল। তিনি ঘরের চালায় বস্তায় ভরে রেখেছিলেন এটি।
মুক্তিযুদ্ধের ৪৫ বছর ধরে জানা ছিল না ভাষা সংগ্রামের রুপকার ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের শেষ পরিনতি আসলে কি হয়েছিল। শুধু ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পরিণতিই নয় নরসুন্দর রমনী মোহন শীলের মৃত্যুর পূর্বে লিখে যাওয়া বর্ননাতে উঠে এসেছে  কুমিল্লা সেনানিবাসে কুমিল্লা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা ২৩ এফএফ ও ২২ বেলুচের সমন্বয়ে গঠিত ৫৩ ব্রিগেড গোলন্দাজ বাহিনীর প্রধান লে. কর্ণেল ইয়াকুব মালিক ২৫ মার্চের পর থেকে আটকে রাখা এবং ২৯ মার্চ বাঙালি সেনাসদস্যরা বিদ্রোহ ঘোষণার পর আটক ১৭ জন বাঙালি অফিসারসহ ৯১৫ জনকে কিভাবে জবাই ও গুলি করে হত্যা করে তার বর্ণনা। জানা গেছে কুমিল্লা শহর ও গ্রাম্য এলাকা শত্রুমুক্ত করার জন্য কথিত সেনাবাহিনী অভিযান চালাতে গিয়ে কি নিষ্ঠুরভাবে বাঙালিদের ধরে এনে নির্মমভাবে হত্যা করতো তার কাহিনী।  জানা গেছে, বিভিন্ কক্ষে আটক ১৭ জন বাঙালি অফিসারসহ ৯১৫ জনকে হত্যার পূর্বে  জেসিও আরিফ খান তাস খেলে মেজর কেরামত তালিকা তৈরি করে। এর ২০ মিনিট পর কাকে আগে কাকে পরে হত্যা করবে তার তালিকা করে। তারপর সে তালিকা থেকে ৩ শ জনকে প্রথমে হত্যার জন্য ও পরে ২ শ’ বাঙালির  তালিকা টাইপ করে এবং আদেশ টাইপ করে তাতে কমান্ডিং অফিসার স্বাক্ষর করে সিল দিয়ে চূড়ান্ত করে। তারপর কাঠাল গাছ তলায়, বড়ই গাছ তলায় কিভাবে তাদের হত্যা করে তার তথ্য পাওয়া যায় রমনী শীলের লিখনিতে। সে তালিকায় থাকা কুমিল্লার জেলা প্রশাসক একেএম শামসুল হক ও পুলিশ সুপার কবির উদ্দিনকে সরিয়ে এফআইওর সুবেদার কার্ক নুর হোসেন তাদেরকে ১৭ বেলুচ রেজিমেন্টের কোয়ার্টারে ঘরে আটক কুমিল্লা ইস্পাহানি পাবলিক স্কুলের ১২ শিক্ষকের সাথে রাখে। পরে শিক্ষকদের সাথে তাদেরও হত্যা করার তথ্যও মিলে সেখানে।
ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাতনি এ্যারমা দত্ত জানান, ১৯৭১ এর ২৯ মার্চ রাত দেড়টায় কুমিল্লা শহরের ধর্মসাগর পাড়স্থ (শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সড়ক) বাড়ি থেকে আমার দাদু ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ও কাকু দীলিপ দত্তকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন বোখারি। এ সময় দীলিপ দত্তের পায়ে গুলি করা হয়েছিল। একটি জিপ, ৫টি ট্রাক ও একটি এ্যাম্বুলেন্স এসে দাদু আর কাকুকে ধরে কুমিল্লা সেনানিবাসে নিয়ে যায়। তারপর থেকে আর কোন খোঁজ আমরা পাই নি।
তিনি জানান, মুক্তিযুদ্ধের পর যখন কুমিল্লা সেনানিবাসে বধ্যভূমিগুলো আবিস্কার হওয়ার সময় নরসুন্দর রমনী শীল আমাদেরকে দাদুকে দেখার কথা সাংবাদিকদের বলেছিলেন। কিন্তু কিভাবে হত্যা করা হয়েছে বা কারা কখন, কোথায় করেছে তা তিনি বলেন নি।
তিনি জানান, ১৯৯০ সালের দিকে তিনি একবার রমনী শীলের সাথে দেখা করেছিলেন।
প্রয়াত রমনী মোহন শীলের ছেলে রাখাল চন্দ্র শীল জানান, বাবা যখন চট্টগ্রামে মিলিটারি একাডেমিতে ‘বারবার’ ঠিকাদার ছিলেন তখন একটু একটু করে সেসব ঘটনা লিখে দিতেন। আর আমি চট্টগ্রাম কোর্ট বিল্ডিংয়ে একজন টাইপ রাইটারকে দিয়ে তা টাইপ করে রাখতাম। টাইপ হওয়ার পর বাবার হাতের লেখা ছিঁড়ে ফেলতে বলতেন, আমি ছিড়ে ফেলতাম। এই লেখাগুলো তিনি কাউকে দেন নি। শুধু বলেছেন ‘তোর কাছে একটি জিনিষ রেখে গেলাম’।
রমনী মোহন শীলের বাড়ি কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার হরিণধরা গ্রামে। তার বাবার নাম কৈলাশ চন্দ্র শীল। জন্ম ১৯২৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর। ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার ২৫ বছর পূর্ব থেকে তিনি কুমিল্লা সেনানিবাসে বারবারের চাকুরি নেন। এক ছেলে ও ৭ মেয়ে নিয়ে থাকতেন সেনানিবাসের কোয়াটারেই। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর তার ছেলে রাখাল চন্দ্র পালিয়ে ভারতে চলে যান। সে সময় তার বয়স ছিল ৯ বছর।
রমনী মোহন শীল লিখে গেছেন, কুমিল্লা সার্কিট হাউসে ১১৭ এফআইও ইউনিটের অস্থায়ী কার্যালয় ছিল। কুমিল্লা শহরের বিভিন্নস্থান থেকে সেখানে ধরে আনা হতো বিশিষ্ট বাঙালিদের। তাদের সার্কিট হাউস থেকে আনা হতো সেনানিবাসের ১৭ বেলুচ রেজিমেন্টের কোয়াটার ঘাটে। সেখানে চালানো হতো নির্যাতন। ঐ বেলুচ রেজিমেন্টের কোয়াটার ঘাটে আটককৃতদের ৮ এপ্রিল রাতে এফআইও ইউনিটের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর তাদের উপর চালানো হয় নির্যাতন। নরসুন্দরের কাজ করে তাকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিয়ে যায় ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলের এফআইও ক্যাম্পে। ৯ এপ্রিল সকালে সেখানে গিয়ে এফআইওও সুবেদার আশরাফ খান (আশরুপ)সহ কয়েকজন হাবিলদারের দাড়ি কাটেন।  এ সময় বাঙালিদের নির্যাতনের দৃশ্য দেখে তিনি বাড়িতে চলে আসেন। বিকাল ৩টায় তাকে আবার সেখানে নেয়া হয়। তিনি দেখতে পান স্কুলের পশ্চিম পার্শ্বে পাহাড়ের উপর এফআইওর সদস্যরা ও কিছু রাজাকার বহু গর্ত করছে। পাহাড়ের চারপাশে পাকিস্তানি সেনারা পাহাড়া দিচ্ছে। স্কুলের বিভিন্ন কক্ষে আটকদের এনে গর্তের কাছে দাঁড় করিয়ে গুলি করে গর্তে ফেলে দেয়। আর বেলচা দিয়ে মাটি কেটে তাদের ঢেকে দেওয়া হয়। ১১৭ এফআইও ইউনিটের মেজন সেলিম খানের নির্দেশে এই হত্যযজ্ঞ চালায় বিকাল ৫টার দিকে তারা।
রমনী মোহন শীল লিখে গেছেন, ‘কুমিল্লার বড় এডভোকেট ধীরেন্দ্র বাবুকে বাড়ি থেকে ধরে কুমিল্লা সেনানিবাসের সিকিউরিটি ব্রাঞ্চে আনা হয়। এরপর বাবুকে বহু ধরনের মারধর করা হয়। এমনকি কারেন্টের সর্টও দেয়া হয়। বাবুকে দুই দিনে দিনের বেলা ব্রিগেড অফিসে আনা নেয়ার সময় তার সমস্ত গায়ে ক্ষতবিক্ষত দাগ দেখেছি। ঐসব ক্ষতে আইডন দিয়ে তুলা লাগিয়ে মাথা ব্যান্ডিস করে রাখা হয়েছিল। ধীরেন্দ্র বাবুকে নিজের চোখে দেখেছি সিকিউরিটি ব্রাঞ্চএর (স্কুলের) পশ্চিমপাশে সুবেদার আশরুপ (আশরাফ খান) বাবুকে গুলি করে হত্যা করে জল্লাদরা।’
তিনি লিখেছেন, আমি স্কুলের পিছুনে একজন জল্লাদের দাড়ি কাটছিলাম। ঐ সময় ধীরেন্দ্র বাবু আমাকে বলে বাবু আমি প্র¯্রাব করবো কোথায়। আমি মুখে না বেল আ্গংুলের ইশারায় বাবুকে বাথরুম দেখিয়ে দেই। ঐ সময় জল্লাদ বাহিনী আমাকে চোখ রাঙ্গিয়ে বলে তুমি ঐ দিকে তাকাচ্ছো কেন? এরপর আর বাবুর দিকে তাকানোর সাহস পাই নি। বাবু অনেক কষ্টে হামাগুড়ি দিয়ে বাথরুমের চারটি সিড়ি উঠানামা করেন। তার কিছুক্ষণ পর বাবুকে স্কুলের পশ্চিমপার্শ্বে নিয়ে সুবেদার আশরাফ সাহেব বাবুকে গুলি করে হত্যা করে।
জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধের পর সুবেদার আশরাফ খানের বিরুদ্ধে কোলাবরেটরস স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়েছিল। যার নম্বর ১৯/৭৪। সে পাকিস্তানি ১৯৫ জন শীর্ষ সামরিক যুদ্ধাপরাধীদের একজন।
ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে পূর্ব বাংলার গণপরিষদ সদস্য কংগ্রেস দলের প্রতিনিধি কুমিল্লার এই ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত (১৮৮৬-১৯৭১) উর্দু এবং ইংরেজির সঙ্গে বাংলা ভাষাকে গণপরিষদের অন্যতম ভাষা রূপে সরকারি স্বীকৃতির দাবি উত্থাপন করেন। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত নিয়ন্ত্রণ বিধির ২৮ ধারার উপর সংশোধনী প্রস্তাব করে তাঁর বক্তব্যে বলেন, এই প্রস্তাব প্রাদেশিকতা মনোভাবপ্রসূত নয়। পাকিস্তানের জনসংখ্যা ৬ কোটি ৯০ লাখ, তার মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লাখই বাংলা ভাষাভাষী, সুতরাং তিনি এই প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। তিনি আরো বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতার কথিত ভাষাই রাষ্ট্রের ভাষা হওয়া বাঞ্ছনীয় এবং তাই  বাংলাই পাকিস্তানের  রাষ্ট্রভাষা  হওয়া উচিত।  নবগঠিত পাকিস্তানে একজন বাঙালির পে এই সাহস প্রদর্শন অবিস্মরণীয়। কণ্ঠ ভোটে প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে যাওয়ার  ফলে বাংলা ভাষা আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক সূত্রপাত ঘটে। আর এই ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই বাঙালি জাতিসত্তার উন্মেষের সূত্রপাত হয় এবং তারই অব্যাহত ধারাবাহিকতায় একাত্তরে সশস্ত্র সংগ্রাম ও ৩০ লাখ শহীদ ২ লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে বিশ্বমানচিত্রে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। ঐ অসীম সাহস প্রদর্শনের অপরাধেই ২৩ বছর পর ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে প্রাণ দিতে হয়েছে।




সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৬
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
কার্যালয়: কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশন, তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়,কুমিল্লা-৩৫০০, বাংলাদেশ
ফোন: +৮৮০ ৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২৪৪৩, +৮৮০ ১৭১৮০৮৯৩০২
ই মেইল: [email protected], [email protected],  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশান।
তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : [email protected] Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};