ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
Count
174
কুমিল্লার নারীসমাজ ঃ আন্দোলন ও সমাজসেবায়
Published : Tuesday, 13 December, 2016 at 3:32 AM, Update: 08.09.2019 3:20:24 PM
কুমিল্লার নারীসমাজ ঃ আন্দোলন ও সমাজসেবায়শান্তিরঞ্জন ভৌমিক ।।
ব্রিটিশ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে ও বৈপ্লবিক আন্দোলনে কুমিল্লার নারীদের অগ্রণী ভূমিকায় দেখা গেছে, তা অবশ্যই অশেষ গৌরবের। এই বিশেষ ত্রেটি রক্তারে লেখা দুটি উজ্জ্বল নাম হলো- ‘শান্তি-সুনীতি’- শান্তি দাস (ঘোষ) ও সুনীতি ঘোষ (চৌধুরী)। কুমিল্লার এ দুই সুকন্যা বা অগ্নিকন্যাই কুমিল্লা স্টিভেন্স হত্যাযজ্ঞের দুই দু:সাহসী নেত্রী। গর্বের কথা- সমগ্র ভারতবর্ষেই নারীদের দ্বারা এরূপ বৈপ্লবিক কর্ম এটাই প্রথম এবং সেদিক থেকে এ ঘটনা ও ঘটনাসংশ্লিষ্ট বীর নায়িকা ‘শান্তি-সুনীতি’ দুটি যুগ্মনাম ইতিহাসের উপাদান। চট্টগ্রাম সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মহানায়ক শহীদ সূর্য সেন (মাস্টার দা) কুমিল্লার বীর কন্যাদ্বয়কে অভিনন্দিত করেন। আজাদ হিন্দ বাহিনীর নারী শাখা গঠনকালে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুও পথিকৃৎ নারী ‘শান্তি-সুনীতি’র নাম উল্লেখ করেন পরম গর্বের সঙ্গে। বিপ্লবী ভুপেন্দ্র কিশোর রেিতর ভাষায়-
‘শান্তি-সুনীতি’ দুইটি মূর্তিমতী জয়শিখার মতো সেদিনকার ভারতবাসীর মানস গগনে বিরাজ করছিলেন।’
এই দুই বীরাঙ্গনার অন্যতম শান্তিদাস কুমিল্লা জেলা ছাত্রী সংঘের সম্পাদিকা ছিলেন। সেদিনে আর একজন সুনীতি চৌধুরী ছিলেন ঐ ছাত্রী সংঘেরই স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর মেজর। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের খ্যাতিমান অধ্যাপক ও দেশপ্রেমিক দেবেন্দ্র নাথ ঘোষ শান্তি দাসের (ঘোষের) পিতা, মাতা সলিলা বালা দেবী ছিলেন একজন দেশকর্মী। অপরদিকে সুনীতি চৌধুরীর (ইব্রাহিমপুর-কুমিল্লার সুকন্যা)
সমগ্র পরিবারই ছিল রাজনৈতিক কর্মকান্ডে লিপ্ত এবং চরম নির্যাতিত- পিতা উমাচরণ চৌধুরী ও মাতা সুর সুন্দরী দেবী। বৈপ্লবিক কাজের জন্য কুমিল্লার দুই অগ্নিকন্যা শান্তি-সুনীতিকে জেলে জেলে কাটাতে হয়েছে বছরের পর বছর। কিন্তু সকল কৃচ্ছ্রতা ও নিপীড়ন বরণ করে নেন তাঁরা হাসিমুখে। সারা জেলখানা তাঁরা মাতিয়ে রাখতেন তাঁদের সুললিত কন্ঠ-সঙ্গীতে, এ কম মনের জোর নয়।
স্বাধীনোত্তর আমলে শান্তি দাস (ঘোষ) পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভার সদস্য (এম,এল,এ) পদে অধিষ্ঠিত হন এবং নানা জনহিতকর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন। সাহিত্য সেবার দিকেও তার ঝোঁক রয়েছে- ‘অরুণ-বহ্নি’ পুস্তকে তিনি আপন জীবন-কাহিনী সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। এদিকে কারামুক্তি লাভের পর সুনীতি ঘোষের (চৌধুরী) জীবনও ভিন্ন খাতে চলে- এম,বি পাশ করে তিনি চিকিৎসা ব্রত গ্রহণ করেন, পাশাপাশি চলেছে সমাজ সেবা, আর্ত মানবতার সেবা। তিনি তার বৈপ্লবিক জীবনের ‘স্মৃতি-চারণ’ ধারাবাহিকভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন ‘আমাদের ত্রিপুরা’ সংস্কৃতি-পত্রে। এ কাহিনী অতিমাত্রায় রোমাঞ্চকর।
শান্তি-সুনীতি দুটি বিপ্লবী নামের সঙ্গে আরও একটি বিপ্লবী কন্যার নাম সমান গর্বের সঙ্গে উচ্চারিত হয়ে থাকে। তিনি হলেন প্রফুল্লনলিনী ব্রহ্ম, কুমিল্লার অন্যতম বীরতনয়া। কুমিল্লার কাকসার আইনজীবী রজনীকান্ত ব্রহ্ম তাঁর পিতা ও মাতা রঙ্গবাসী ব্রহ্ম, সমগ্র পরিবারই ছিল স্বদেশী ভাবাপন্ন- পিতার প্রেরণায় প্রফুল্ল নলিনী কৈশোরেই দেশের কাজে এগিয়ে আসেন এবং ‘যুগান্তর’ দলে দীতি হন। বিপ্লবীদের দেওয়া তাঁর সাংকেতিক নাম ছিল ‘সুমিত্রা’। এই বিপ্লবী নেত্রী ছিলেন কুমিল্লা জেলা ছাত্রী সঙ্খের সভানেত্রী, সহকারী শান্তি-সুনীতির স্টিভেন্স হত্যা বৈপ্লবিক কর্মানুষ্ঠানের সঙ্গে সঙ্গে তাঁকেও গ্রেপ্তার করা হয়- বন্দীশালায়ই সরকারি উপােয় তাঁর অকাল মৃত্যু ঘটে- তিনি শহীদ হন।
স্বাধীনতা সংগ্রামের আর একটি অত্যুজ্জ্বল নাম হেমপ্রভা মজুমদার- কুমিল্লার তথা বাংলার এক মহিয়সী বীর নারী। কাশীনগর -এর নির্যাতিত দেশকর্মী বসন্তকুমার মজুমদারের সহধর্মিণী তিনি, দেশ-গৌরব সুভাষচন্দ্রের সংগ্রামী সাথী ও অবিভক্ত বাংলার অবিসংবাদী জননেত্রী।
পরাধীন আমলে বৃহত্তর বাংলার নারী জাগরণে হেমপ্রভা মজুমদারের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য- তাঁর তেজোদৃপ্ত ভাষণ ও আহবান আজও অনুরণিত হবে অনেকের কানে। ১৯২২ সালেই মহিলা কর্মী- সংসদ নামে একটি কর্মী সংগঠন গঠন করে তিনি কাজে নেমেছিলেন। তার আগে চাঁদপুর ও গোয়ালন্দ স্টিমার ধর্মঘটকালে স্বামী বসন্তকুমার মজুমদারের পাশে থেকে ধর্মঘটীদের এবং আসাম প্রত্যাগত অসহায় চা-বাগান শ্রমিকদের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। দেশের কাজে বহুবার তাঁকে কারাবরণ করতে হয়- তাঁর দু কন্যাও শান্তিপ্রভা ও অরুণা রাজরোষে পড়েছেন, নির্যাতিত হয়েছেন একই কারণে।
হেমপ্রভা দেশগৌরব সুভাষচন্দ্রের ফরওয়ার্ড ব্লকের একজন অগ্রণী নায়িকা ছিলেন। ১৯৩৭ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। কলকাতা কর্পোরেশনেরও তিনি ছিলেন এককালীন অল্ডারম্যান। হেমপ্রভাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন-
কোন্ অতীতের আঁধার ভেদিয়া
আসিলে আলোক-জননী।
প্রভায় তোমার উদিল প্রভাত
হেম-প্রভা হল ধরণী।
............................
এসো বাঙলার চাঁদ- সুলতানা
বীর-মাতা বীর-জায়া গো।
তোমাতে পড়েছে সকল কালের
বীর-নারীদের ছায়া গো।
শিব-সাথে সতী শিবানী সাজিয়া
ফিরিছ শ্মশানে জীবন মাগিয়া,
তব আগমনে নব-বাঙলার
কাটুক আঁধার রজনী।
স্বদেশ সেবার েেত্র কুমিল্লায় সেদিনে আরো দুই বিপ্লবী নারীর বিশিষ্ট ভূমিকা দেখতে পাওয়া যায়। তাঁরা দু’ বোন- পারুল মুখার্জী ও উষা মুখার্জী (ময়না), অনুশীলন দলের খ্যাতনামা বিপ্লবী নেতা অমূল্য মুখার্জী তাঁদেরই বড় ভাই- পিতা গুরুপ্রসন্ন মুখার্জী, মাতা মনোরমা দেবী। বিপ্লবী দাদার প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে পারুল মুখার্জী কুমিল্লায় একটি বিশেষ সম্মেলন উপলে স্বেচ্ছাসেবিকা বাহিনী গঠন করেছিলেন। উষা মুখার্জীও ছিলেন এই বাহিনীর উৎসাহী কর্মী। দু’ বোনই ক্রমে ‘অনুশীলন সমিতি’র সক্রিয় কর্মী হয়ে উঠেন এবং বিপ্লব- কর্মের জন্য কারান্তরালে নিপ্তি হন। পারুল মুখার্জী দলের একজন বড় সাংগঠনিক ছিলেন এবং বাংলার বিভিন্ন স্থানে তিনি সংগঠন শক্তিশালী করে তোলেন। শেষে টিটাগড় ষড়যন্ত্র মামলায় তিনি জড়িত হন এবং কুমিল্লার এই বিপ্লবী কন্যার কারাদন্ড হয়।
বিপ্লবী নায়িকা প্রতিভা রায় চৌধুরীর (ভদ্র) নামটিও গৌরবের সঙ্গে এেেত্র উচ্চারিত। একসময়ে অনুশীলন সমিতির সাংগঠনিক হিসেবে কুমিল্লা-আগরতলাতে তাঁর কর্মকেন্দ্র বিস্তৃত ছিল। বিপ্লবীপ্রবর হরিকুমার রায়চৌধুরীর সুযোগ্য পতœী প্রতিভা রায় চৌধুরীকে সেদিনে কুমিল্লা (ত্রিপুরা) জেলা রাজনৈতিক সম্মেলন, কুমিল্লা (ত্রিপুরা) জেলা ছাত্র সম্মেলন, চট্টগ্রাম বিভাগীয় মহিলা সম্মেলন- প্রত্যেকটিতে সক্রিয় ভূমিকা নিতে দেখা গেছে। পরে তিনি সুভাষচন্দ্রের নেতৃত্বাধীন বি,পি,সি,সির সদস্য হন। এবং মহিলা সাব কমিটির সহকারী সম্পাদিকা নিযুক্ত হন। বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দলের প্রাদেশিক কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন ১৯৪৬ সালে তিনি। বিভিন্ন আন্দোলনে যোগদান করে তিনি কারান্তরালে নিপ্তি হন একাধিকবার। জেলে থাকাতেই তাঁর সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ জন্মে, পরে তিনি ‘অঙ্গনা’ মাসিক পত্রের সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বিপ্লবী নারী সুপ্রভা কর (ভদ্র), প্রতিভা রায় চৌধুরীর সহোদরা। সুপ্রভা কুমিল্লা-খেউড়ার বিপ্লবী রাখাল করের সুযোগ্য পতœী।
বিভা চৌধুরী (গুপ্ত) দেশ সেবায় একজন নির্যাতিত মহিলা। তিনি কুমিল্লার খ্যাতনামা দেশকর্মী বিপ্লবী পুলিন গুপ্তের সহোদরা। চাঁদপুর মহকুমা কংগ্রেসের এককালীন সভাপতি উপেন্দ্রনাথ ঘোষের সহধর্মিণী। বিভাবতী ঘোষ একজন নিরলস দেশকর্মী ও সমাজসেবী হিসেবে সমকালে প্রসিদ্ধিলাভ করেছিলেন।
১৯৩২ সালের আইন অমান্য আন্দোলনে কুমিল্লার অন্যান্যদের সঙ্গে যে সব দেশকর্মী নারী কারাবরণ করেন, তাঁরা হলেন- গীতারানী ভৌমিক, হিরন্ময়ী দেবী, অমিতা রায়, উষারানী পালিত, সবিতা সরকার, শান্তশীলা পালিত, সুহাসিনা মুখোপাধ্যায়, নির্মলা সরকার, চারুশীলা দেবী, অরুণা মজুমদার, সরযূ বসু, হেমলতা পাল প্রমুখ।
বিপ্লবী কন্যা প্রমীলা গুপ্তের বাড়ি ছিল লাকসামে। তিনি ছিলেন ঢাকার ‘শ্রীসংঘ’ এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং ‘জয়শ্রী’ পত্রিকার (বিপ্লবী নায়িকা লীলা রায় সম্পাদিত) পরিচালিকাদের অন্যতম। দেশের কাজে ছাত্রী অবস্থাতেই এক সাহসী নারী কারাবরণ করেন।
কুমিল্লার নারী প্রিয়দা সুন্দরী দত্ত কারাদন্ডে দন্ডিত হন। তিনি ছিলেন বরেণ্য জননায়ক অখিলচন্দ্র দত্তের (চারগাছ-কুমিল্লা) সুযোগ্য সহধর্মিণী। দেশের কাজে কারাবরণ করেছেন কুমিল্লার নারী সরমা ভট্টাচার্য, নীলিমা মুখার্জী, অন্নদা দাসগুপ্তা, সুষমা পাল, শৈল ধর, নির্মলা সরকার, শিশুবালা ঘোষ, বাণী ব্যানার্জী (চৌধুরী), আরো অনেকে।
কুমিল্লার গুপ্ত বিপ্লবী দলের (যুগান্তর গোষ্ঠী) মহিলা শাখায় যাঁরা ছিলেন, তাঁরা হলেন- উর্র্মিলা গুহ, নীলিমা নন্দী, বনলতা সরকার, শান্তি সেন, ঊষা চক্রবর্তী, জাহানারা চৌধুরী, মনোরমা সেন, সুহাসিনী পাল, অরুণা মজুমদার প্রমুখ। দেশসেবার েেত্র আর একটি দীপ্ত নাম সুশীলা মিত্র (ঘোষ), কুমিল্লার বহু নির্যাতিত তেজস্বী কন্যা তিনি।
গৌরবের সঙ্গে উল্লেখ করতে হয় বিদ্যাকূটের বিপ্লবের পূজারিণী সুষমা বর্মণের নাম, ধামতি-কাসারিখোলার বিনোদিনী দেবী, চুন্টার দীপ্তি চক্রবর্তী। গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করতে হয় কুমিল্লার আদর্শ নারী মৃণালিনী দত্তের কথা। জননায়ক কামিনী কুমার দত্তের সহধর্মিণী তিনি। দেশপ্রেম ও দরদী-হৃদয় এ নারীর একটি বড় ভূমিকা চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার অভ্যূত্থানের বীর নায়ক অনন্ত সিং এর আত্মগোপন অবস্থায় তিনি নিজেদের কুমিল্লা ভবনের (বর্তমান মৃণালিনী ছাত্রীনিবাস) চিলেকোঠায় তাঁকে নিরাপদ আশ্রয় দিয়ে রেখেছিলেন। পুলিশের রক্ত চুর আড়ালে দিনের পর দিন সেবা-যতœ করেছিলেন আপন পুত্রের মতো। এই ইতিহাস- এই অজ্ঞাত কাহিনী বিবৃত হয়েছে বিপ্লবী অনন্ত সিংহেরই রোমাঞ্চকর আত্মজীবনীতে।
কুমিল্লার গলিয়ারার বধূ স্বর্ণময়ী দেবী ছিলেন বিয়াল্লিশের (১৯৪২) আন্দোলনের সময় দেশকর্মীদের নিরাপদ আশ্রয়দাত্রী। স্মরণীয় সেই ৯ আগস্ট রাত্রিতে এই মমতাময়ী-নারী স্বগৃহে সমবেত বহু দেশকর্মীকে ধান-দুর্বা মাথায় দিয়ে আন্দোলনে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। নিজ পুত্রকেও আর্শীবাদ জানিয়ে একই সঙ্গে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। এ ধারায় কুমিল্লার নবীনগরের জমিদার গোপিকামোহন রায় চৌধুরীর পতœী আত্মগোপনকারী বিপ্লবীদের নানাভাবে সাহায্য করেছেন। এমন কী সিন্দুকের তালা খুলে দিয়ে অলংকার নিয়ে যেতে বলেন। মুক্তিপাগল বিপ্লবীদের চোখে তিনি ছিলেন পরম ¯েœহশীলা মাতৃসমা, কালীকচ্ছের ¯েœহলতা দেবী, বিদ্যাকূটের কৃপাময়ী দেবী, কুমিল্লার অন্নপূর্ণা দেবী, তীর্থবাসী দেবী, বিদ্যাকূটের মানদা সুন্দরী সকলেই ছিলেন বিপ্লবীদের আশ্রয়দাত্রী। এককালে কুমিল্লার নারীসমাজ স্বাধীনতা আন্দোলনে যেমন আত্মনিয়োগ করে গৌরবের ভূমিকা রেখেছিলেন, সমাজসেবাও তাঁদের অংশগ্রহণ ছিল ঐতিহাসিক মূল্যায়নে সমৃদ্ধ। বিশেষত অভয় আশ্রমের সঙ্গে অনেক মহিলা সক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট থেকে কঠিন ব্রত পালন করে গেছেন পরম নিষ্ঠার সঙ্গে। এঁদের মধ্যে কুমিল্লার কন্যা-বধূ ছিলেন না অনেকেই কিন্তু আবাসভূমি ও মুখ্য কর্মস্থল হিসেবে এ স্থানটি বেছে নিয়েছিলেন,
১. যমুনা ঘোষ- কুমিল্লা অভয় আশ্রমের সেবাকার্যে একটি নিবেদিত প্রাণ। তিনি ড. প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষের ভগ্নী ছিলেন। ‘কন্যা শিালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন ও সুদ পরিচালিকা ছিলেন।
২. লাবণ্যলতা চন্দ। কুমিল্লা ফয়জুন্নেছা বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিকিা ছিলেন। অভয় আশ্রমের সঙ্গে একাত্ম হয়ে আজীবন গঠনমূলক সমাজসেবায় নেতৃত্ব দেন। কুমিল্লা অভয় আশ্রমের পরিচালিত ‘কন্যা শিালয়ের’ তিনিই ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা-সঞ্চালিকা।
৩. নিভা রায় (প্রখ্যাত দেশকর্মী স্বর্ণকমল রায়ের কন্যা) পাঠ্যজীবন থেকে কুমিল্লা অভয় আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত থেকে অব্যাহত ধারায় সমাজসেবা কাজে ব্রতী ছিলেন।
৪. নমিতা সেনগুপ্তা (চুন্টা-ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংসদিক বিধুভূষণ সেনগুপ্তের কন্যা) আদিবাসী জনতার সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন।
৫. মিনু দত্ত- কুমিল্লা অভয় আশ্রমের মহত্তর কর্মযজ্ঞে তিনিও একজন নিবেদিতা প্রাণ, কুমিল্লার কন্যা, সমাজসেবাই বেছে নিয়েছিলেন জীবনের আদর্শরূপে।
৬. সাধনা চক্রবর্তী- কুমিল্লার নারী জাগরণে তাঁর বিশিষ্ট ভূমিকা রয়েছে- কুমিল্লা গণতান্ত্রিক নারী সমিতির তিনিই সভানেত্রী।
৭. শান্তশীলা পালিত (বসু) কুমিল্লার একটি অত্যুজ্জ্বল নাম। তিনি অভয় আশ্রমের প্রাণপুরুষ স্বনামধন্য সেক্রেটারি ডা. নৃপেন্দ্রনাথ বসুর সহোদরা। সমাজসেবায় তিনি ছিলেন চির নিবেদিত। স্বাধীনতা আন্দোলনেও তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল।
৮. সমাজসেবায় ও দেশসেবায় কিংবদন্তী নাম সুশীলা মিত্র (ঘোষ), দেশে যখন স্বদেশী আন্দোলন -অসহযোগ আন্দোলন, লবণ আইন আন্দোলন প্রভৃতি সুশীলা মিত্রকে দেখা গেছে বিশেষ ভূমিকায়- বিপ্লবীদের তিনি সর্বতোভাবে সাহায্য দিতেন, পরিচর্যা করতেন মায়ের মতো। ১৯৩২ সালে কংগ্রেস আন্দোলনে অংশগ্রহণ করায় তিনি গ্রেপ্তার হন। আড়াই মাসের একটি শিশু কোলে, সঙ্গে আরো দুটি শিশু-তিন, পাঁচ বছরের। এই কচি শিশুরা জেলে গেলে আর বাঁচবে না- বন্দী জননীকে বলা হলো ‘বন্ড’ লিখে দিলে তাঁকে মুক্তি দেয়া হবে। কুমিল্লার তেজস্বিনী কন্যার দৃপ্ত জবাব- ‘দেশের হাজার সন্তানের সঙ্গে আমার সন্তানরা যদি বলি যায়, তবে আমি গৌরববোধই করব- একটি বারও চোখের জল ফেলব না।’ সুশীলা মিত্রের সাংগঠনিক মতা ছিল অসাধারণ।
৯. একজন একনিষ্ঠ সমাজসেবী ও দেশকর্মী প্রফুল্লমুখী বসু (গুহঠাকুরতা), কুমিল্লার যিনি আপন কর্মশক্তির স্বার রেখেছেন নানাভাবে, কুমিল্লাবাসীর কাছে তিনি ‘টুনীদি’ নামেই সুপরিচিতা বাল্যবিধবা তিনি-পুনর্বিবাহে অসম্মত দেখে পিতা যোগেন্দ্রনাথ গুহঠাকুর তাঁর প্রাণপ্রিয় কন্যাকে সমাজসেবামূলক কাজে ও স্বাদেশিকতায় শিা দেন। রাজনৈতিক ক্রিয়া-কলাপে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করার দরুণ তিনি একাধিকবার কারারুদ্ধ হন। পরে তিনি কুমিল্লা নিবেদিতা স্কুলের শিায়িত্রীর দায়িত্বগ্রহণ করেন।
১০. কনকপ্রভা ভট্টাচার্য-দানবীর মহেশচন্দ্র ভট্টচার্যের পুত্রবধূ, হেরম্বচন্দ্র ভট্টাচার্যের সহধর্মিণী। কুমিল্লা ঈশ্বর পাঠশালার অনুকল্প একটি আদর্শ বিদ্যালয় পরমারাধ্য শ্বশুর মহাশয়ের পুণ্য স্মৃতিতে গড়ে তোলবার প্রস্তাব যখন হলো, সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজ নামের সাত বিঘা জমি পুজনীয় স্বামীর হাতে তুলে দেন। কলকাতা দত্তপুকুর ‘মহেশ বিদ্যাপীঠ (২৪ পরগণা) আজ যা মাথা উচু করে দাঁড়িয়েছে তার ভিত্তি প্রতিষ্ঠার মূলে রয়েছে মহীয়সী নারী কনকপ্রভা ভট্টাচার্য।
১১. বীথিকা চৌধুরী (দত্ত) বরেণ্য জননেতা শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের কন্যা। কুমিল্লা অভয় আশ্রমের কাজের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন।
ব্রিটিশ ভারতে কুমিল্লার নারীসমাজ স্বাধীনতা আন্দোলনে ও সমাজসেবায় নিজেদের যেভাবে উজাড় করে আত্মোৎসর্গ করেছিলেন, ইতিহাস পর্যালোচনায় যেমন বিরল, কুমিল্লাবাসী হিসেবে উত্তর প্রজন্মের কাছে অনেক বেশি অহংকার ও গৌরবের। এখানে একটি সময়ের কথাই বলা হলো। পরবর্তীতে যাঁরা সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে দেশ-জাতি-সমাজ তথা মানুষের জন্য জীবনযাপন করেছেন, তাঁদের কথা এখানে উল্লেখ করতে না পারলেও শ্রদ্ধায় ও কৃতজ্ঞতায় তাঁদের স্মারণ করছি।









© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৮
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ই মেইল: [email protected], [email protected],  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন
কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : [email protected] Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};